• শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১০:৫৯ অপরাহ্ন

একটি জীবনদাত্রি খেজুর গাছ !

বিবিসি একাত্তর ডেস্ক / ৪৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ২০২১

সাইফুল ইসলাম বাবুল

আমি একটি খেজুর গাছ অমার কোন ব্যক্তি নাম নেই । গেরস্থের মুরব্বিরা ভিটা সাজাতে বাড়ীর সীমানায় আমাকে রোপন করে। মধ্যে মধ্যে আমরা ফলবীজ ছড়াছড়িতে বাড়ীর আঙ্গিনায় চলে আসি। কাটাযুক্ত বলে আমাকে কোন গবাদি পশু খায়না । তাই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলাম। তাল গাছের মত যেন “ উকি মারে আকাশে ” তবে পার্থক্য আছে । অমাকে কেটে খাজ তৈরি করা হয় রসের আশায় । তাই প্রতি শিতে আমি স্বরনীয়। ভাফা পিঠার সাথে আমার রস অনেককে আনন্দ দেয়।

মাঝে মধ্যে কিছু পাখি আমার ছুড়ায় বাসা বাঁধে।এ হচ্ছে আমার সাংবাৎসারকি জীবন রীতি।প্রকৃতির বিরুপ ছোবলের সাথে আমি চির পরিচিত। কালবৈশাখী , ঘূর্ণিঝড়,টর্নেডো এ সব ভয়ংকর রূপসীদেও সাথে আমি পরিচিত। অমি একটু উচা বলে সবার সাথে আগে সাক্ষাৎ হয়। তাই আমি শক্ত শিকড এবং মজবুত শরীর নিয়ে তৈরি থাকি। জনপদ বিরান হলেও আমি এবং নারিকেল সহজে প্রস্থান করিনা । তবে রস সংগ্রহ ছাড়া মনুষ্য কুলে আমি প্রায় অবহেলিত। আমার তেমন যতœ নেই, সামান্য পেলেও ছোট বেলায়। তবে আমার সান্তনা সারা জীবনে একটি রাতকে ধারণ করে আমি মনুষ্য হৃদয়ের অংশ।

কুতুবদিয়ার উত্তর ধরুং আজিম উদ্দিন পাড়ায় আমার অবস্থান। ২৯ শে এপ্রিল ১৯৯১ সেই জীবন সংহারি ঘূর্ণি ঝড় দুই লাখের উপর মানুষ মারা যায়। অগনিত গবাদি পশু , বেসে যাওয়া ঘর বাড়ী এসব দেখলে ফেরদৌস ওয়াহিদের কথায় মনে পড়ে…
“ঘূর্ণি ঝড়ে জলোচ্ছ্বাসে মানুষ ভাসে ,
ভাসেরে ভাই ঘর বাড়ী বাংলাদেশেগোয়ালেতে গরু নাই যে ,
মাঠে নাই ছাগল
প্রাণ ছাড়া সব হারাল ,
নাই কোন সম্বল
একি গজব নাজিল হইল জৈষ্ট্য মাসে,
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে”।……..

এ সব অমি দেখেছি, তাদের সাথে মিতালী করে আমার অভিজ্ঞতা শরৎ চন্দ্রের সমুদ্র সাইক্লোনের গল্পের চাইতেও বেশী । শরৎ বাবু জাহাজে ছিলেন । আমি কিন্তু তাদের ভিতর ডুবে ছিলাম। মনুষ্য হৃদয় সদা সতর্ক নয়। ইলশে গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে আবহাওয়া বার্তা শুনা যাচ্ছে। বার বার যখন ঘূর্ণিবাবু মিলিয়ে যায় । সে রীতিতে মানুষ আর ঘূর্ণিবার্তা কর্নপাত করচেনা । আমার এলাকাতে গুটিকয়েক মুজিব কিল্লা, দু একটা পাকা ঘর আর তেমন কিছু নেই । থাকলেও মনেহয় আশ্রয়ে যাওয়ার ভাবনা ছিলনা । রাখাল বালকের সেই বাঘ সত্যিই সে দিন আসিল । সময় কম , শিশু সন্তান সন্ততি , বৃদ্ধ মা বাবা নববধু থেকে সবাই বিপদ বেষ্টিত। বুক কি খালি হবে ? ছেড়ে যাবে কি নব বধু? বৃদ্ধ মা বাবাকে নিয়ে কি করি? ভাববার বা প্রশ্নোত্তের সময় নাই। এসে গেল পাষান দরিয়ার পানি। সাথে ভ্রমান্ডকাপানো বাতাস, মহান পরীক্ষা কে কার সাথে যাবে ?

প্রকৃতিতে অওয়াজ , কোন সময় নাই। নিয়ে যাব এটাই ঠিক। তবে পরপারে না ইহপারে ? কোন বিচার হবেনা । শুধু শোক স্মৃথি বয়ে বেড়াবে। অশ্রু আসলেও আসতে পারে । তবে স্মৃথিতে থাকবে। বিয়োগ ব্যাথা হৃদয় থাকবে ব্যাথাতুর। প্রকৃতির এক কিংভূত ষড়যন্ত্র , যার সাক্ষী আমি। একটু দেখিয়ে না দিলে কি হয়? অমি প্রবল বাতাসে দুলছিলাম মনে হচ্ছে এই বুঝি পড়ে গেলাম। পানির শ্রুতে হয়ত এক অনিদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছে যাব। কিন্তু নিচে দেখলাম আমার আশ্রয় দাতার বংশ ধরেরা আমার নিছে আমাকে অরোহন করতে ব্যস্ত। যখন চাচা আপন প্রান বাচা অবস্থা তখন আমি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নিদের্শন রেখে যাই। সুযোগ পেলাম ঝাপটা উপেক্ষা করে ধারণ করলাম। অমিত একবীজ পত্রী উদ্ভিদ ডাল পালা নেই। তাই কোন রকমে সে সময়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র বর্তমান দৈনিক হিমছড়ির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হাছানুর রশিদ সহ ছয জনকে ধারণ করলাম। তারা পরম মমতায় আমাকে ঝড়িয়ে ধরল । ক্ষেত্র বিশেষে আমাকে পরনের কাপড় দিয়ে আমাকে তাদের সাথে বেধে ফেলল । ঢেউ আর বাতাস বাধ গুলো ছিড়ে ফেলল । আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করলাম মানুষের বাচার আকুতি। জল আমায় আকুন্ট নিমজ্জিত করল। অমার আপন জনেরা আমাকে ধারন করে আছে। তারা বিবস্ত্র । অন্য দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভাটির টানে চলে যাচ্ছে ধরণী , মনে হয় আমাদেরও নিয়ে যাবে।

পানি কমল যাদের সাথে গতরাতে আমার গভীর আত্থয়তা হল তারা নেমে দেখল তাদের চারিদিকে সীমাহীন রীক্ত হাহাকর কেউ নেই। কোথায় যাবে তারা , খাদ্য পানীয় কিছুই নেই। আবার হারাল স্নেহ,মায়া,মমতা,ভালবাসা।মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায় তাই হয়ত তারা বদলাচ্ছে । কিন্তু অকৃত্রিম হারানো ভালবাসা , কি ফিরে পাবে ? পাবে কি সাজানো গোছানো শৈশব স্মৃথি , নিজ গ্রাম । স্বাভাবিকতায় ফিরতে ফিরতে হয়ত মৃত্যু হবে । কিন্তু আমি দাড়িয়ে ভালবাসব, স্মৃথি হযে থাকব, যেন নিরব সাক্ষী , আমার আপনজনেরা এখনো আমাকে জড়িযে ছবি তোলে স্মৃথির কান্ন্ায় ভেসে যায় । তাই আপনারা আমাদেও সাথে মিতালী করুন । বাড়ী,রাস্তায় কিংবা খালি জায়গায় অমাদেও মত বন্ধুদের জায়গা দিন। এক দিন ভালবাসুন আমরা চিরদিন ভালবাসব। বৃক্ষ রোপন করুন ,প্রকৃতির ভয়াল রূপকে মোকাবিলা করুন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category