• মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৩৭ অপরাহ্ন

একটি নক্ষত্রের বিদায়

বিবিসি একাত্তর ডেস্ক / ৫৬ Time View
Update : শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১
শাহ আব্দুল হান্নান, মাসুম খলিলীর কলাম, সচিব, চেয়ারম্যান, www.dailynayadiganta.com

নাজমুল হক
বাংলাদেশ সরকারের সচিব বা সেক্রেটারি আমলাতন্ত্রের বিশাল পদ-পদবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সচিবালয়ের সচিবরা দায়িত্ব পালন করেন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীদের সাথে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের কোন কোন মন্ত্রীর সততা আছে, যোগ্যতা আছে, কোন মন্ত্রী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, কোন মন্ত্রী আত্মীয়বান্ধব, কোন মন্ত্রী জনবান্ধব, কোন মন্ত্রী দেশপ্রেমিক, কোন মন্ত্রী মানবহিতৈষী, কোন মন্ত্রী সদাচরণ করেন, কোন মন্ত্রী ঘুষখোর এবং লুটপাট চালান তা একমাত্র সচিবালয়ের সচিবরা জানেন। আমলারা কাজ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মেয়র পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ইত্যাদির জনপ্রতিনিধির সাথে। রাজনৈতিক দলের সরকারের পরিবর্তন ঘটে, মন্ত্রীর পরিবর্তন ঘটে কিন্তু সচিবালয়ে সচিবরা থেকে যান যুগ যুগ ধরে।

বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব শাহ আব্দুল হান্নানের সাদাসিধা জীবনযাপন, নীতি-নৈতিকতা, আচার-আচরণ, বিদেশ ভ্রমণ, সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে দৈনিক প্রথম আলোয় লিখেছেন সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।

বাংলাদেশ সরকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ আমলাতন্ত্র; আমলারা একটি সরকারের সুখ-দুঃখের অংশীদার। তারা সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতি, দুর্নীতিমুক্ত সরকার, জবাবদিহিতামূলক সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গগুলোর সব স্তরে দায়িত্ব পালন করেন আমলারা। একজন গ্র্যাজুয়েট অথবা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট নাগরিক বিসিএস ক্যাডার হিসেবে আমলাতন্ত্রের কর্মজীবন শুরু করেন সহকারী কমিশনার পদে। এই পদে নিয়োগ দেয়ার পরে মাঠ প্রশাসনের জেলা প্রশাসক অফিসে যোগদান করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পরিচালনা, এসিল্যান্ড, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, সহকারী সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব এবং সিনিয়র সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তেমন একজন আমলা ছিলেন শাহ আব্দুল হান্নান।

কবির খান সচিবালয়ের সচিব হিসেবে লিখেছেন- ‘উত্তর গোড়ান নিবাসী সচিবের কথা’ শিরোনামে। তিনি আমলাদের বসবাস টাকা-কড়ির কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন আমাদের কাছে- ‘সচিব এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, লালমাটিয়া, ডিওএইচএসে অট্টালিকা, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকে। বাগানবাড়ি থাকে, গরু-মহিষের বাথান, চিংড়ি ঘের, রিসোর্ট, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি নানান কিছু থাকে। আবার অনেকের নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, দুবাই, সিঙ্গাপুর, হিউস্টনে অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি, মলের মালিকানা থাকে।’

তিনি লিখেছেন, ‘শাহ আব্দুল হান্নানের কিছুই ছিল না অথচ তিনি শুল্ক ও আবগারি বিভাগের কালেক্টর, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও ব্যাংকিং বিভাগের সচিব ছিলেন। তার শেষ ঠাঁই ছিল পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভাইবোনদের সাথে যৌথ মালিকানায় উত্তর গোড়ানে গড়ে তোলা বাড়ি।’

একজন সিনিয়র সিটিজেন এবং নাগরিক হিসেবে কবির সাহেব লিখেছেন- ‘সচিব, আমলা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরির পাশাপাশি ধন-সম্পদের হালচাল। মাঠ প্রশাসন থেকে সচিবালয়ে চাকরি করে অনেকেই অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে যান। এই বিরাট ধন-সম্পদের জোয়ার শাহ আবদুল হান্নানকে গ্রাস করতে পারেনি। কি বিচিত্র দৃশ্যের অবতারণা করে গেছেন হান্নান সাহেব। এখন অসৎ সচিব, আমলাদের অনুভূতিতে সততা এবং বিবেক, দেশপ্রেম জাগ্রত হবে কি? কানাডা, দুবাই, মালয়েশিয়া, লন্ডন, আমেরিকায় টাকা পাচার এবং বাগানবাড়ি তৈরি করা বন্ধ হবে কি? একটি জাতীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সততার বিকল্প কিছু নেই। দুর্নীতিমুক্ত সমাজের বিকল্প কিছু নেই। সরকার একটি বিচার বিভাগের সহযোগিতায় আমলা জরিপ চালিয়ে সৎ অফিসারদের পুরস্কৃত করে জাতিকে ঘুষের অভিশাপমুক্ত করতে পারে।’

স্ত্রীর আবদার বিদেশ ভ্রমণ : আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্ত্রীরা আমলাদের বিদেশ ভ্রমণ, টাকাকড়ি, বাড়ি-গাড়ি নিয়ে একে অপরের ভাববিনিময় ও আবদার স্বামীর কাছে করে থাকেন, একজন সৎ থাকা আমলা স্ত্রীর আবদার পালন করতে গিয়ে ঘুষখোর হিসেবে টাকা কামাই করেন।

ফাওজুল কবির লিখেছেন, ‘খাবার টেবিলে বুলবুল আপা খানিকটা অনুযোগের স্বরে হান্নান ভাইকে বললেন, দেখো, কবির ভাই (আমি) কেমন আমার বোনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছর থেকে এলো। তুমিও তো একই বিভাগে কাজ করো। তোমার এতদিন চাকরি হলো, তুমি তো আমাকে কোথাও নিয়ে গেলে না!’ হান্নান ভাই বললেন, ‘কবির ব্রিলিয়ান্ট অফিসার। ওর কথা আলাদা!’ আমতা আমতা করে একটা জবাব দিয়ে বিষয়টি এড়াতে চাইলেন। স্ত্রী তো দূরের কথা, অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ হান্নান ভাইয়ের সরকারি কাজে বিদেশ যেতেও অনীহা ছিল।

হান্নান-বুলবুল দম্পতির বিদেশযাত্রা : কবির সাহেব জানান, তার বাসায় বেড়ানোর বছরখানেক পর ব্রাসেলসে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অরগানাইজেশনের (ডব্লিউসিও) একটি সভায় যোগ দিই। সেখানে তখন আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী মনযুর মান্নান (পরে দুদকের সদস্য)। সেখানে মান্নান ভাইকে খাবার টেবিলে আপার আক্ষেপের কথা তুলে তাদের কিভাবে বিদেশে পাঠানো যায়, তা নিয়ে আলাপ করি। মান্নান ভাই বললেন, হান্নান ভাইয়ের স্ত্রীর আক্ষেপ সঠিক। সার্ভিসের আমরা সবাই নিজেও স্ত্রীসহ নানান দেশে সফর করেছি। আমরা দু’জন আলাপ করে স্থির করি, ডব্লিউসিওর মহাসচিব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানকে ব্রাসেলসে তাদের সদর দফতর ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাবেন। ডব্লিউসিও তার সফরের সব ব্যয়ভার বহন করবে। হান্নান-বুলবুল দম্পতি মান্নান ভাইয়ের বাসায় তাদের সাথে থাকবেন। এই সুযোগে মিসেস হান্নান একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

বিদেশ সফরে আমলাদের স্ত্রীর কাজ কী? কবির সাহেব লিখেছেন- প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনসহ সারসংক্ষেপ চেয়ারম্যানের কাছে ফিরে এলে আমার ডাক পড়ে। আগেরবার রাগের মাথায় পুরো সারসংক্ষেপ পড়েননি। এবার পড়েছেন, বললেন, ‘ব্রাসেলসে তোমার আপার কাজ কী? তার বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ কে দেবে?’ আমি বললাম, ‘বাংলাদেশ বিমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে আপনার স্ত্রী ১০ শতাংশ ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারেন। আর ব্রাসেলসে আপনারা মান্নান ভাইয়ের বাসায় থাকবেন।’ তিনি নিমরাজি হলেন।

বিদেশ যাওয়ার জন্য ট্রলি ব্যাগ নেই : কবির সাহেব লিখেছেন- ‘সমস্যা হলো, তাদের বাসায় বিদেশে যাওয়ার কোনো ভালো ব্যাগ নেই। টিনের বাক্স আছে, তা নিয়ে তো আর ব্রাসেলসে যাওয়া যায় না! আমরা সদ্য বিদেশফেরত। স্যুটকেস, ট্রলি সবই আমাদের আছে। তাদের বাসায় পৌঁছে দিলাম। আমাদের পরিকল্পনা সফল হলো, হান্নান-বুলবুল দম্পতি বিদেশ সফর করে ফিরে এলেন।’

উত্তর গোড়ানে কেন থাকেন : কবির সাহেব লিখেছেন- অনেকবার আমি এবং অন্য অনেকে তাকে রাজউকের জমির জন্য আবেদন করতে বলেছেন। তিনি বারবারই বলেছেন, ‘ঢাকায় আমার এজমালি হলেও একটি পৈতৃক সম্পত্তি আছে। আমি মিথ্যা ঘোষণা স্বাক্ষর করতে পারব না। তা ছাড়া আবেদনপত্রের সাথে জমা দেয়ার ও কিস্তির টাকাই-বা আমি কোথা থেকে দেবো?’ আমরা রাজউকের দু’জন চেয়ারম্যান ও পূর্ত সচিবকে তাকে বলতে শুনেছি, ‘স্যার, আপনি কেবল আবেদন করেন। বাকিটা আমরা দেখব।’ তিনি কোনোমতেই রাজি হননি। আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার যে নজির শাহ আব্দুল হান্নান রেখে গেছেন, তা বিরল।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাঙালি চাকরি বা পদ পেলে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুঁজে বের করেছিলেন একজন সাদামাটা জীবন যাপনকারী সচিব শাহ আবদুল হান্নানকে যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কোনো অভিযোগ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক সিএসপি সচিব-সিনিয়র সচিব জন্ম নিয়েছে দেশ ও জাতির জন্য; তাদের অবদান কতটুকু?

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রতি এবং প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সচিব গুণীজনরা মারা গেলে শোকবার্তায় সংহতি প্রকাশ করেন কিন্তু শাহ হান্নান শোক প্রকাশ করা বাণী পাননি। অথচ ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লুটেরা মারা গেলে শোকবার্তা পেয়েছে। জলমহাল দখলকারী পেয়েছে। অথচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর এই জাতির কাছ থেকে কিছু পেলেন না। এটা খুবই দুঃখজনক।

সাদাসিধা জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত সাবেক সচিব শাহ আব্দুল হান্নানের অসুস্থতা নিয়ে ফেসবুকে কোটি কোটি ভক্ত দোয়া করেছেন। শাহ আব্দুল হান্নান রাজউক থেকে ফ্ল্যাট-প্লট বাড়ি গ্রহণ করেননি। এই রকম সাদামাটা জীবনের অধিকারী সচিবকে মরণোত্তর একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদকে পুরস্কৃত করা উচিত নয় কি?

কবির সাহেব লিখেছেন- ‘আমি ক্ষণজন্মা এই মানুষটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাদের সন্তান ইমু ও ফয়সালের প্রতি সমবেদনা। তাদের বলি, এমন একজন মানুষকে পিতা হিসেবে পাওয়া যেকোনো সন্তানের জন্য একটি বিরল সম্মান। সারা পৃথিবীজুড়েই শাহ হান্নানের অসংখ্য ভক্ত আছে, একজন নির্লোভ দেশপ্রেমিক মানবহিতৈষী সচিব হিসেবে হান্নান সাহেব পাওয়া বাঙালি জাতির জন্য ভাগ্যের বিষয়।’ বাংলাদেশ সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে দ্বিতীয় শাহ আব্দুল হান্নান। সম্মান জানানো উচিত মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন আমলাদের। শাহ হান্নান সাহেব প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবতার সাহায্যকারী হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে হলে সততা ও যোগ্যতাসম্পন্ন সচিবদের মূল্যায়ন করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category