• বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন

কতজনের মুখ বন্ধ থাকবে?

তৈমূর আলম খন্দকার / ৪৭ Time View
Update : শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

তৈমূর আলম খন্দকার

কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরায় সম্প্রতি যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তা এখন সবার মোবাইলে, যা নিয়ে রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার বিষয় সবাই জেনেছেন। তবে সরকারি দল এ মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্টকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে আখ্যায়িত করছে। সরকারি ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা এ চ্যানেলের সংবাদকে মিথ্যা প্রমাণের জন্য যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। আলজাজিরা সম্প্রচার এ দেশে বন্ধ করার জন্য হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। সরকারবিরোধীরা সঙ্গতকারণেই আলোচনার বিষয়বস্তু খুঁজে পেয়েছেন। গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ বলেছেন, ‘রিপোর্ট নিয়ে কিছু বলতে চাই না। কেননা এ বয়সে আমার জেলে যাওয়ার শখ নেই।’ গত ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ : বাংলাদেশ’ আয়োজিত সাম্প্রতিক ‘কাশ্মির পরিস্থিতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ইসরাইলের সাথে কোনো সম্পর্ক হলে বাংলাদেশে মুক্তির আন্দোলন হবে না, সব আরব দেশ বাংলাদেশের বিপক্ষে চলে যাবে। কিন্তু আমরা কখন কী করছি, তা এখন ইসরাইলি যন্ত্রের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে।’ (জাতীয় পত্রিকা, ৭ ফেব্রুয়ারি-২০২১)
সরকারের অন্যতম সমালোচক ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী আলজাজিরাকে নিয়ে কথা বলতে জেলের ভয় করছেন। সঙ্গতকারণেই তাদের রিপোর্টের ওপর কলাম লেখাও অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাংলাদেশে কতটুকু বিদ্যমান তা-ও মাথায় রাখা যুক্তিসঙ্গত। আলজাজিরা নিয়ে আলোচকদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা যা-ই হোক না কেন, সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। কারণ রিপোর্টটি সত্য কি মিথ্যা বা কতটুকু সত্য বা কতটুকু মিথ্যা তার প্রমাণ দিয়ে জনগণের কাছে প্রকাশ করার দায়িত্ব সরকারের। ক্ষমতাসীন মহল থেকে বলা হয়েছিল, বিষয়টির ওপর মামলা করার জন্য সরকারের প্রস্তুতি চলছে। সরকারকে তথ্য-উপাত্ত দিয়েই মামলা করতে হবে এবং এ রিপোর্ট যে মিথ্যা তারও প্রমাণাদি পেশ করতে হবে। একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার পরিজন নিয়েও আলজাজিরা (তাদের মতে) জোরালো বক্তব্য রেখেছে। এ সম্পর্কেও সরকারকেই বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। নতুবা এ আলোচনা-সমালোচনা বাড়তেই থাকবে। ভয়ে কত দিন মানুষ মুখ বন্ধ রাখবে, আর কতজনের মুখ বন্ধ রাখা সম্ভব? এ দিকে করোনার টিকা নেয়ার বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা করোনা টিকা নিজেরা নিয়েছেন এবং এ টিকা নেয়ার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করছেন। বিরোধী দল থেকে কিছু বক্তব্য দেয়া হচ্ছে, এ বক্তব্যকে প্রতিহত করার জন্যই ক্ষমতাসীন দলের এ উত্তেজনা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচনী উৎসবের মতো টিকা নেয়ার উৎসব চলছে। যিনি ‘সার্কাস মার্কা’ নির্বাচন দিয়ে জাতির সাথে তামাশা করেছেন, তার মুখে যদি টিকা উৎসবের বাণী শুনানো হয় তবে এর মর্মার্থ যা-ই হোক না কেন, জাতির কাছে এটি কি হাস্যস্পদ নয়?
দেখা যাচ্ছে, ভেজাল মদ খেয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। মদখোর মদ খেয়ে মরে যাবে এতে খুব হতাশ হওয়ার কিছুই নেই। কিন্তু একজন ব্যক্তি যখন একটি পরিবারের সম্পদ এবং সমাজের সদস্য, তখন তার মৃত্যু পরিবার ও সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ছাড়াও বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৮(১) এ বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষত: আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় স্বাস্থ্যহানির ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বে¡ও মদ বিক্রি, মদ তৈরি প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট দফতরের জ্ঞাতসারেই হচ্ছে। মদ খেয়ে জেলায় জেলায় মানুষ মারা যাওয়া যখন শুরু হয়েছে তখন টনক নড়েছে, শুরু হয়েছে ধরপাকড়। মদের দোকান, বার বা মদ প্রস্তুত করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। তার পরও বিভিন্ন স্থানে মদ তৈরি ও ব্যবসায় করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে এবং এই সুবাদে ভেজাল মদ তৈরিও হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। ভেজাল মদ তৈরির কারখানার খবর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানেন না এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মদ ও নেশায় যুবসমাজসহ সমাজের উঁচু তলার একটি অংশ ডুবে রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অন্ধকার জগতে প্রবেশ করছে উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানরা। এমনকি মেয়েরাও। ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবসহ তিন তারকা থেকে পাঁচতারকা হোটেলে ডিজে পার্টি হয় এবং সে পার্টিগুলোতে প্রধান ‘আকর্ষণ’ হলো যৌন উন্মাদনা। এ কারণে পারিবারিক জীবনে অশান্তি নেমে এসেছে যার পরিণতি খুনের মাধ্যমে নতুবা আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা দিলেও ব্যর্থতার দায় নিয়েই সরকারকে চলতে হচ্ছে।
সংবিধানের (২)ক অনুচ্ছেদ মোতাবেক বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। কোনো প্রকার নেশা করা যেমন ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের সংবিধানে নেশা বা মদ তৈরি বা বিক্রি বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিলেও এখানেও ব্যর্থতার দায় নিয়ে চলতে হচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় এই, দায়িত্ব মাদক প্রতিরোধ করা হলেও পুলিশের একটি অংশ মাদকের সাথে জড়িত বলে পত্রিকায় প্রায়ই অভিযোগ প্রকাশ পাচ্ছে। তারা নাকি মাদক ছাড়াও নানাবিধ অপরাধে জড়িত। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয়ে একজনকে তুলে নেয়ার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ছয়জন পুলিশ সদস্যকে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ছয়জনই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত। (জাতীয় পত্রিকা, ১০ ফেব্রুয়ারি-২০২১) চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির জন্য অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো পুলিশ চাঁদাবাজি করে, মাদক ব্যবসায় করে এ কোনো নতুন সংবাদ নয়। তবুও কেন তারা দিন দিন বেপরোয়া হচ্ছেন? অনুসন্ধানে দেখা যায়, নির্বাচনে কারচুপি ও বিরোধী দলকে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে বিরত রাখার জন্য ভুয়া মামলা দেয়ায় প্রধান হাতিয়ার হলো কোনো কোনো বাহিনীর। তাই পুলিশ মনে করে, তারাই সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। ফলে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে টু-পাইস কামিয়ে নেয়ার প্রবণতা দিনে দিনে পুলিশের একটি অংশকে দৃশ্যত অনেকটা বেপরোয়া করে তুলেছে।
চার দিক থেকে সমাজের অবক্ষয় শুরু হয়েছে। শুধু উন্নয়নের কথা বলে এ অবক্ষয় দূর করা যাবে না। উন্নয়ন মনে প্রশান্তি বা পরিবারে সমৃদ্ধি আনে না। কেবল অবকাঠামো বা ইট-সিমেন্টের উন্নয়ন জনগণের কাম্য নয়। মানুষ সুখে শান্তিতে ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে চায়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি একই দড়িতে মা-মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা কিসের আলামত বহন করে? দেশের জনগণ সার্বিকভাবে কি ভালো বা স্বস্তিতে আছে? এ প্রশ্নের জবাব বা ব্যাখ্যা সরকার দেবে, এটিই তো জবাবদিহিতা। কিন্তু জবাবদিহিতা নেই বলে জনগণকে একতরফাভাবে একমুখী প্রচারণা শুনতে হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের মুদ্রার মতো ভিন্ন পিঠ থাকার কথা গণমানুষ উপলব্ধি করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র তা উপলব্ধি করতে পারছে কি না, তা আঁচ করা যাচ্ছে না।

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category