• সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

চকরিয়ায় সুদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনে স্ত্রীর আত্মহত্যা

বিএম হাবিব উল্লাহ,কক্সবাজার / ১২০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০২১

কক্সবাজারের চকরিয়ায় স্বামীর দেনা পরিশোধে সুদের মাশুল গুণতে গিয়ে স্বামীর নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ তিন সন্তানের জননী তসলিমা আক্তার(৩৩) নিজেকে শেষ করতে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেচে নিলেন। সম্প্রতি এ গৃহবধুর ঘরের এক কন্যাসন্তানের বিয়ে হয়েছে। তবে বাকী ২ সন্তান ৫ ও ৮ বছরের ২ শিশু সন্তানের মা হারার বেদনায় মূহুর্তেই যেন ঘটনাস্থলের চারিদিকের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছিলো। কারোর সান্তনায় যেন থামছিলো না শিশু দুটির কান্না। ঘটনাটি ঘটেছে চকরিয়া পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের উত্তর কাহারিয়াঘোনা খন্দকার পাড়ায়। সূত্র জানায়, নিজেকে জামানত রেখে, স্বামীর নেয়া মোটা অংকের টাকার সুদের মাসুল দিতে গিয়েও স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধুর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ মার্চ পবিত্র শবে বরাতের রাতে চকরিয়া পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের উত্তর কাহারিয়াঘোনা খন্দকারপাড়ার বহিরাগত বাসিন্দা ভ্যান চালক মোঃ সেলিমের স্ত্রী ৩ সন্তানের জননী নিজ বাড়ীর বারান্দায় চালের তীরে পরিত্যক্ত মশারির সাথে গলায় পেচিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে এ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। এদিন রাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের ফোনে চকরিয়া থানার ওসিকে ঘটনাটি অবহিত করলে, তিনি থানার এসআই মোশাররফ ও সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্স পাঠান ঘটনাস্থলে। স্থানীয়দের উপস্থিতিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছেঁ লাশের সুরতহাল করে রাত ১টা নাগাদ ময়না তদন্তের জন্য থানা হেফাজতে নিয়ে যায়।পরের দিন ৩০ মার্চ ময়না তদন্তের পর গৃহবধুর লাশ তার বাবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলে জোহর নামাজের পর করাইয়াঘোনা জামে মসজিদ কবরস্থানে দাফন করা হয়৷ ঘটনার দিন থেকে সুদী মহাজনরা ও স্বামী এলাকা ছাড়া বলে জানা গেছে। সরেজমিন, গতকাল ৩০ মার্চ ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকাবাসী ও আশেপাশের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওই এলাকার বহিরাগত বাসিন্দা গৃহবধূ তসলিমার স্বামী মোঃ সেলিমের পৈতৃক নিবাস বিএম চরের বহদ্দারকাটা গ্রামে। ৪/৫ বছর আগে বিরোধীয় একটি জমি ক্রয় করে সেমি পাঁকা দালান নির্মাণ করে বসবাস করে আসছিলো। গৃহবধূ তসলিমার বাবার বাড়ি পাশের গ্রাম করাইয়াঘোনায়। তিনি স্থানীয় মৃত জাগের মেম্বারের মেয়ে। ঘর নির্মাণের শুরু থেকে স্বামী সেলিম বিভিন্নভাবে তসলিমার ভাইদের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়েও সংকুলান না হওয়ায় বিভিন্ন জায়গা থেকে ৫ লাখ টাকা মতো সুদে স্বামীর জন্য টাকা নেয়। নানা অভাব অনটনসহ প্রায় ৫ লাখের অধিক ঋণের টাকায় সুদ এসেছে অনেক গুণ। বার বার মহাজনি নিয়মে মূল টাকার অধিক সুদের টাকা পরিশোধ করে আসলেও আসল টাকার সাথে গাণিতিক হারে বৃদ্ধি হতে থাকে সুদ। সম্প্রতি কিস্তিতে নেয়া স্বামীর চালিত ট্রলি গাড়ীটিও আটকে রাখে মৌলভীরকুম বাজার এলাকার পাওনাদার। ঘটনাটি স্থানীয় মিজানুর রহমান কন্ট্রাকটার জানার পর স্বামী সেলিমকে মোবাইল ফোনে বলেন, তুমি বউয়ের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করিও না। তোমার ট্রলিগাড়ি আটকানো ও তোমরা নিজেদের বিষয়ে সামাজিকভাবে এশার নামাজের পর মিমাংসা করা হবে। তাতেও কান দেয়নি সেলিম। এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামী ঘরে এসে স্ত্রীর সাথে আবোলতাবোল বাকবিতন্ডায় আসরের নামাজের পরে স্ত্রীকে একদফা মারধর করে। ফের এশার নামাজের আগ মূহুর্তে দ্বিতীয় দফা মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ঘরে তালা মেরে দেয়। সূত্র জানায়, এসময় সেলিম মসজিদে চলে গেলে , গৃহবধু তসলিমা ঘরের দরজার সামনে বারান্দায় চালের তীরের সাথে মশারী বেধে গলায় পেছিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার পথ বেচে নেয়। জানা যায়, বিভিন্ন সময় পাওনাদারেরা বাড়িতে এসে স্বামীর অনুপস্থিতিতে তসলিমাকে মানুষিকভাবে হেনস্তা করে আসছিলো। পাওনাদার আসার খবর পেলেই সেলিম অন্যত্র সরে যেতো। এ নিয়ে ৩-৪ মাস আগেও স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর ফোরকানুল ইসলাম তিতুর বাড়িতে স্বামী স্ত্রীর গরমিল ও পাওনাদারদের টাকা পরিশোধে স্বামীর অবহেলার কারণে তাকে চাপ দেওয়া হয়। এদিকে বিভিন্ন সূত্র দাবী করছে, সেলিম স্ত্রীকে এক প্রকার বন্ধক রেখেই বেশ কয়েকটি সুদি এনজিও থেকে সুদের বিনিময়ে টাকা নিয়েছে। পরিবার সূত্রে জানায় ট্রলিগাড়িটিও সপ্তাহে কিস্তির উপর ভিত্তি করে সুদে স্বামীকে কিনে দিয়েছেন তসলিমা।
তসলিমার ভাইয়েরা জানায়, সেলিম ও তাদের বোনকে সুখে রাখতে তাদেরকে দেয়া হয়নি এমন কিছু নেই। বিয়ের পর থেকেই বোনকে শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন করে আসছিলো সেলিম। যখন যা চেয়েছে তখন তা দিয়েছি আমরা। অসংখ্য বার তাদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক বৈঠক করে তাদের সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। তারা দাবী করেন সেলিম ঘরে স্ত্রী সন্তান রেখে পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়েছে কয়েকবছর ধরে। মাসে কয়েকদিন ঘরে থাকলেও প্রায় সময় রাত কাটায় সে ঘরের বাহিরে। সেলিম সুকৌশলে তার নিজস্ব লেনদেনে তাদের বোনকে জড়িত করে দিয়ে সে লা-পাত্তা হয়ে যায়। স্বামী ও পাওনাদারের নির্যাতনের সময় গুণতে হয় তাদের বোনকে। এ ঘটনায় চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাকের মোহাম্মদ যুবায়েরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আত্মহত্যায় নিহত গৃহবধু তসলিমা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category