• মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১৫ অপরাহ্ন

প্রবাস জীবন সংযুক্ত আরব-আমিরাত -২

বিবিসি একাত্তর ডেস্ক / ১৩২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০২১

মো. ফোরকান উদ্দিন

বিমানে অনেকটা মজা হলো। একজন সুদর্শন পুরুষ আরবি ও ইংরেজিতে লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিলেন একটু এনজয় হবে। আপনাদের মাঝে এমন কেউ কি আছেন! যিনি একটি এরাবিক গান শুনাতে পারেন? শিল্পী (Singer)কে ফাইভ হান্ড্রেড দেরহাম অনার করা হবে। একজন যুবক হাত তুলে হ্যা সূচক জবাব দিলো,– তার হাতে লাউডস্পিকার দেওয়া হলো খুব সুন্দর করে আরবিতে একটা গান গাইলেন। যাত্রীরা সবাই হাততালি দিলেন। যুবকটি ৫০০ শত দেরহাম নগদ জীতে নিলেন।

সুদর্শন ঘোষক যুবক আবার ঘোষনা দিলেন, আর কেউ আছে কিনা আরেকটি গান শুনাতে পারেন? কেউ হাত উঠালো না, তিনি অনেকটা আশাহত হয়ে বললেন পুরো গান না জানলেও চলবে, অর্ধেক অথবা দুয়েক লাইন। তবুও কেউ হাত উঠালেন না। এবার তিনি বললেন কেউ কি একটা বাংলা গান গাইতে পারেন? অনেকে হাত উঠালো একজন কে সুযোগ দেওয়া হলো, তিনি গাইলেন ৫০০শত দেরহাম জীতে নিলেন। এবার ঘোষনা দেওয়া হলো আপনাদের আপ্যায়ন করা হবে হালকা পানীয়। চা,বা কপি যিনি যা পছন্দ করেন। তবে শর্ত আছে পয়সা দিতে হবে কপি ১৫ দেরহাম, চা ১০ দেরহাম।

একজন যাত্রী কপি খেল আর কোন যাত্রী কপি বা চা খেলোনা। ঘোষক অনেকট খুশি হয়ে ঐ যাত্রী থেকে ১৫ দেরহাম নিলেন না। মনে হলো এতেই তিনি বেশী সন্তুষ্ট। কেননা এতো গুলো যাত্রীকে চা, কপি পরিবেশন অনেকটা ঝামেলার। তার মুখে মৃদু হাসিতেই বুঝতে পারলাম আমাদের সাথে অনেকটা চালাকি করে পানীয়ের দাম চাওয়া হয়েছে। ফ্রি বললে সবাই খেতে চাইতো?

যাক চা, কপি না পেলেও যাত্রীদের সবাই দুইটি করে চায়ের মগ (প্লাস্টিকের) পেল (এয়ারএরাবিয়ার লোগো লাগানো) একটি করে হাফ লিটার পানির বোতল। আমরা এতেই খুশী। ঘোষক সবাইকে সালাম দিয়ে বিশ্রামের আহবান জানিয়ে লাইট অপ করে বিদায় নিলেন। ঘন্টাখানেক সময় অনেকটা আনন্দে কাটলো।

আমার সিট জানালার পাশে ছিলো বাহিরের আকাশ মাঝেমাঝে বিমানের পাখা দিয়ে বরফ কাটার শব্দ তরতর করে বিমান কেঁপে উঠছে অনুভব করছিলাম। নিচের দিকে থাকালাম যেন আসমান নিচে। আর আমরা উপর থেকে আসমান কে দেখছি।

বসতি, গাছপালা, নদনদী, সমুদ্রকে মনে হয় আকাশের কাল্পনিক গ্রহ, তারকা নীহারিকা ও নানা রকম নান্দনিক শিল্প।সবচেয়ে বেশী আনন্দ অনুভব করেছি ভারত ও আরব সাগর পাড়ি দেওয়ার সময়। সাগরের বুকে দ্রুত চলমান বড় পানির জাহাজ গুলো, ছোট গুলো পিঁপড়ের মতো মনেহয় দেখতে বড়গুলো কিছুটা দেখা যায়, অসাধারণ এক সুন্দর মুহূর্ত। বিমান ল্যান্ড করার সময় আরবের লাল পাহাড় মরুভূমি উঠের পাল, আরব আমিরাতের লতা পেচানো, মোড়ানো রাস্তায় গাড়ির দৌঁড়াদৌঁড়ি, জানালার পাশে না বসলে বুজাই যেতনা কতটা সুন্দর লাগে।

স্থানীয় সময় ১২টা৩০ মিনিটে বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা৩০মিনিটে আমাদের বিমান শারজাহ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করলো। বিমান থেকে এয়ারপোর্টে পা রাখতেই পুরো শরীর চ্যাৎ করে উঠলো। সারা শরীর মনে হলো পুড়ে গেলো। এ যেন কেয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হয়েছি, তাপমাত্রা এতোই প্রখড় ও তেজস্ক্রিয় ছিলো মনে হয় এখনই আবার বিমানে উঠে পড়ি। অনেকটা ময়দানের মতো গোটা দেশটাকে অনেকটা উজ্জল ও লালচে মনে হলো। আমার অবস্থা দেখে একজন বলে উঠলো ভাই চিন্তা করবেন না সব ঠিক হয়ে যাবে। এপ্রিল মাস গরম অনেকটা কম (তাপমাত্রা ৪০°ছুই ছুঁই মাত্র, জুন জুলাইয়ে ৫০°পার হয়ে যায়) ছাড়াও আমরা সাড়ে পাঁচ ঘন্টা বিমানে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিলাম তাই এই অবস্থা। মাথা নেড়ে সাই দিয়ে পা বাড়াতেই সামনে হাজির এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরীন বাস!

ড্রাইভার ডাকছে এসো গাড়ীতে উঠো। মার্সিডিজ বাসটি ঝকঝকে-তকতকে হলেও ড্রাইভারটা মধ্যবয়সী। তিনি বাংলায় কথা বলছেন ও পেসিঞ্জারদের গাড়ীতে উঠার আহবান জানাচ্ছেন। যেন চট্রগ্রামের নতুন ব্রিজ থেকে চকবাজার নিউমার্কেট যাবে। আমাদের সাথে কয়েকজন ট্রানজিট যাত্রী ছিলো কাতার ও ওমানের। তারা ড্রাইভারকে বলছে যে আমরাতো ওমান, কেউ কাতার যাবো? গাড়ীতে উঠতে যাবো কেন? ভদ্রলোক জবাব দিলেন এটাই ওমান, কাতার যাবে!

পুরোনো প্রবাসী অনেকে হেসে উঠলো বুঝিয়ে বললো ৩০মিনিট পর একই বিমান, ওমান হয়ে কাতার চলে যাবে।জানতে পারলাম মার্সিডিজের ড্রাইভার একজন মিশরীয় অনেকটা বাংলাদেশের যাত্রী চট্টগ্রামের যাত্রী বহন করতে করতে বাংলা শিখে ফেলেছে এমনকি অনেকটা চট্টগ্রামের ভাষাও রপ্ত করে ফেলেছে।ইমিগ্রেশনে অনেকটা টেনশনে পড়ে গেলাম নতুনদের হাতে একটি করে পেপার দেওয়া হলো পুরণ করার জন্য আরবী ও বাংলাতে লেখা। বাংলা দেখে অনেকটা ভয় কেটে গেলো। পেপারটায় পুরণ করে ভাবছি কোথায় জমা দেবো। সবার দেখাদেখি আমিও একজায়গায় জমা দিলাম। এরপর কোথায় যাবো?

একজন পুলিশ সামনে পেলাম, আগে থেকে ধারণা ছিলো আরবের পুলিশ খুবই ভাল। আমি তাঁকে হেল্প বলতেই তিনি বললেন, জদিদ? তার মানে নতুন কিনা! আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। তিনি আমাকে বাম পাশে ইশারা করে বললেন “হালা”। আমি অনেকটা থ হয়ে গেলাম, তিনি আমাকে হালা বললেন কেন?চট্রগ্রামের ভাষায় শালাকে হা’লা বলা হয়।বাম পাশে তাকাতেই আমার ভুল ভাঙ্গে। একটি ডেক্স দেখলাম উপরে লেখা ইংরেজি ও আরবীতে হা’লা, চেয়ারে একজন সুন্দরী বসে আছে লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে একজন একজন করে পাসপোর্ট দেখে তাহার ল্যাপটপে দেখছে এবং হাতে একটি করে কাগজ ধরিয়ে দিচ্ছে। বুজতে পারলাম এটাই হা’লা। মনে মনে ভাবলাম হালা না বলে হা’লী বললে অনেকটা যুক্তিযুক্ত হতো। ৩০ মিনিট লাইনে দাড়িয়ে হা’লার নিকট পৌঁছলে সুন্দরী মেয়েটি পাসপোর্ট চাইলেন। কম্পিউটারে চেক করে অনেকটা শুদ্ধ বাংলা ভাষায় বললেন আপনি ওখানে বসুন, আপনার কাগজ এখনো আসেনি। একটু হতাশা ও চিন্তায় পড়ে গেলাম। চেয়ারে বসে চিন্তা করছি কি করা যায়! একজন বাঙালী ভাইকে মোবাইল আছে কিনা জানতে চাইলাম তিনি সাথে সাথে মোবাইল দিলেন এবং আমি নতুন এসেছি শুনে তিনি বললেন চিন্তা করবেন না। আপনার যতক্ষণ দরকার কথা বলুন আমার মোবাইলে আমিরাতের সিম সেট করা আছে।ভদ্রলোককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম।

এখানে অর্থাৎ আমার আরব-আমিরাত যাওয়া বিষয়ে একজন মানুষকে স্মরণ বা কৃতজ্ঞতা না জানালে আমার লেখা অপুর্ণতায় রয়ে যায়। তিনি হলেন আমার স্পনসর বা আমার সার্বিক সহযোগী চকরিয়া আমিরাত প্রবাসী ফোরামের সম্মানিত উপদেষ্টা প্রিয় বন্ধু আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক, তাহার সার্বিক সহযোগিতা না পেলে হয়ত আমার আরব আমিরাত দেখা সম্ভব ছিলোনা। আল্লাহ আমার বন্ধুকে হায়াতে তৈয়বা নসীব করুন আমিন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category