• শুক্রবার, ০৬ অগাস্ট ২০২১, ০৬:২৪ পূর্বাহ্ন

প্রবাস জীবন সংযুক্ত আরব-আমিরাত

বিবিসি একাত্তর ডেস্ক / ১০৬ Time View
Update : শুক্রবার, ১৮ জুন, ২০২১

মো. ফোরকান উদ্দিন

প্রত্যেকটা মানুষের বিদেশ সফর বা ভ্রমণ এক নষ্টালজিক এডভেঞ্চার বা স্বপ্নের নাম। মানুষ মাত্রই স্বপ্নবিলাসী ভ্রমণ পিপাসু। যে কোন কাজে বা উসিলায় অথবা সখ করে হলেও সামর্থবানরা অনেকে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। বেশী বেশী ভ্রমণ অদেখা অচেনা জায়গা দেখা একপ্রকার সুন্নতও। জ্ঞান অর্জনের জন্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী চৌধুরী বেশী বেশী দেশ ভ্রমণ করতে বলেছেন, না হয় বেশী বেশী বই পড়তে বলেছেন। আর সামর্থবানরা বইও পড়েন দেশও ভ্রমণ করেন।

আমার আজকের লেখাটাকে ভ্রমণ কাহিনী না বলে শ্রমিক কাহিনী বললেও যুক্তিযুক্ত মনে করি। উদ্দেশ্য ছিল রথ দেখা কলা বেছা। –খুব সম্ভবত ১৩ ই এপ্রিল ২০১২ সাল। চট্রগ্রাম শাহআমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ২নম্বর টার্মিনাল। ইমেগ্রেশন শেষ করে অপেক্ষা করছি কবে উড়াল দেবো স্বপ্নের দেশ আরব আমিরাতে। আমার ফ্লাইট ছিলো সকাল ৯.৩০ মিনিটে। এয়ারএরাবিয়া চট্রগ্রাম টু শারজাহ।

ইমিগ্রেশনে ছোট একটি মজার ব্যাপার ঘটেছে না বললে নয়। মালামাল, টিকেট, পাসপোর্ট, ভিসা সব কিছু চেকআপ অনেকটা ভালভাবে খুব অল্প সময়ে শেষ হলো। দায়িত্বরত একজন সেনা অফিসার টুকটাক প্রশ্ন করলেন, প্রথম যাচ্ছেন? ওখানে কে আছে? ভিসা কে দিয়েছে? তার পাসপোর্ট কপি থাকলে দেন। আমি সব কিছুর উত্তর দিলাম সর্বোচ্চ ১ মিনিটে তবে আমার স্পনসরের ব্যক্তিগত পাসপোর্টের কোন কপি না থাকায় দিতে পারিনি। ভদ্রলোক এতেই সন্তুষ্ট হলেন, ইশারা করলেন যান! এরপর একজন নিরাপত্তা কর্মী শারীরিকভাবে চেকআপ করলেন। তিনিও ছেড়ে দিলেন। শেষ ধাপে একজন মধ্যবয়সী মহিলা জানতে চাইলেন পকেটে বাংলা কোন টাকা পয়সা আছে কিনা! এক সেকেন্ড চিন্তা করলাম এই ম্যাডামতো ছাড়বে না পকেটে ৩০০ বাংলা টাকা আছে। দুই পকেটে ভাগাভাগি করে বললাম জি ম্যাডাম দেড়শ আছে! মহিলাটিকে আমার পকেট থেকে দেড়শো টাকা দিয়ে দিলাম। এরপর ও মহিলাটির সন্দেহ দুর হলো না। বললো, আরেকটু দেখেন আমার মনে হয় আপনি মিথ্যা বলছেন। এ বলেই নিজেই আমার প্যান্টের পকেটের উপর দিয়ে হাতড়াচ্ছেন। একপ্রকার লজ্জা ও সংকোচ এসে চোখেমুখে ভর করলো। কেননা আমি আসলেই মিথ্যে বলেছি। আমার কাছে ৩০০ টাকা ছিলো এই ম্যাডামের নিকট বলা উচিত ছিলো।

ইমেগ্রেশনে বাংলাদেশের টাকা বৈধ কি অবৈধ আমার ধারনা ছিলো না। পকেট থেকে বাকি দেড়শো টাকাও আমার অসহায় ভগ্নির নিকট দিয়ে দিলাম। কি মনে হলো জানিনা ওনি আমাকে পঞ্চাশটি টাকা ফেরত দিলেন। আমি অবশ্যই ঐ টাকাও ১০ টাকার চিপস ২০ টাকা দিয়ে আর একটা পানির বোতল (হাফলিটার) ২০ টাকা দিয়ে কিনে খেয়েছি। বাকি ১০ টাকা পাঁচ বছর পর দেশে আসার সময় পকেটে করে নিয়ে এসেছি। এই হচ্ছে আমার মোটামুটি বিদেশ সফরের সুচনা।

তবে ভিআইপি ভিভিআইপিদের ব্যাপারে আমার তেমন ভালো ধারনা না থাকায় আরো উন্নত সুচনা আছে কিনা জানা নেই।সকাল ৯ টা বাজে এয়ারএরাবিয়ার কোন ফ্লাইট বিমান বন্দরে অপেক্ষামান। দেখলামনা দু’একটা অভ্যন্তরিন বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট যাত্রী উঠানামা করছে।

মনের মধ্যে একটা হাহুতাশ কাজ করছে। কিছু আনন্দ কিছু ভয়ও! কেননা এই প্রথম বিমানে চড়া। যাত্রীদের লাউঞ্জে বসে বসে সময় পার করছি বাহিরে স্বজনরা অপেক্ষা করছে কবে বিমান আসবে। আমি আকাশে উড়াল দেবো আর তারা বাড়ি ফিরবে।হাতের মোবাইলটা ছোট ভাইকে দিয়ে এসেছি। যার কারনে একশো গজের মধ্যে স্বজনদের অবস্থান সত্ত্বেও যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। মনে মনে ভাবছিলাম মোবাইলটা দেওয়া উচিত হয়নি। এখনো দেশে অবস্থান করছি তারপরও মনে হচ্ছে প্রবাসে আছি।

যাক আর মাত্র কয়েক মিনিটইতো সময় আছে! বিদেশে কি এতো কম দামের মোবাইল চলে? আমাকে আগে থেকে ট্রাভেল এজেন্সি ইনফর্ম করেছিলো। বিদেশি এসব বিমান যথাসময়ে সিডিউল মেনটেইন করে। কোন রকম অলসতা করা যাবেনা। ৯টা১০ এর মধ্যে এয়ারআরাবিয়া ল্যান্ড করলো। বিমানের যাত্রী পাইলট বিমানবালা সহ সবাই নামলো দেখলাম সর্ব্বোচ্চ ১০ মিনিট লাগলো। ৯টা ২০মিঃ এ লাউডস্পিকারে ঘোষনা এলো এয়ারএরাবিয়ার ফ্লাইটে চট্রগ্রাম টু শারজাহ যাবেন, যাত্রীরা উঠে পড়ুন। টিক ৯,৩০ মিনিটে বিমান গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। আমরা বিমানে উঠে পড়লাম পাইলট এয়ারহোষ্টেস সবাই আমাদের স্বাগত জানালেন, সালাম বিনিময় করলেন হাতও মেলালেন।

বিমান যখন আকাশে সমান্তরাল হয়ে সাঁ সাঁ করে উড়ছে তখনই বাড়ীতে ফেলে আসা সেই প্রিয় আপনজনের কথা মনে পড়ছে। নিয়তি কি আরেকবার দেখার সুযোগ দিবে? নাকি এটাই শেষ দেখা? দুই চোখে তখন নিরবে গড়িয়ে পড়ছে বর্ষা এই মুহূর্তটা কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়।বিশেষ করে আমার ছোট ১০ মাসের মেয়েটার কথা খুব বেশী মনে পড়ছে সবে মাত্র বা বা করে ডাকতে শিখেছে আর আমার জামা কাপড় ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আর ধপাস করে পড়ে যায়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বড় মেয়েটার কথা, নাস্তা যতই খায়না কেন এর পরও রাস্তার ধারে উঁকি মেরে দাঁড়িয়ে থাকতো, আমি কবে বের হবো আর ৫/১০টাকা হাতিয়ে নিবে।

আর স্কুলে না যাওয়া মেজো মেয়েটার কথা, খুবই শান্ত প্রকৃতির কোন দাবী নাই যা পেতো এতেই খুশী। ছেলেটা ১২/১৩ হয়ে গেছে তার জন্য মন কাঁদলেও সত্যি এই তিন মেয়ের জন্য মনটা খুব খারাপ লেগেছে এবং এই কান্না বলতে গেলে প্রবাস জীবনের পাঁচটি বছর হৃদয় জুড়ে স্থিতিশীল ছিলো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category