• রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০২:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সমস্যা

বিবিসি একাত্তর ডেস্ক / ৫২ Time View
Update : রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ বিশেষ করে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বহুলাংশে রোধ করেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার যে মোহ ছিল সেটি এখন নেই। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো এমন কিছু সমস্যা রয়ে গেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। এখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ২০ শতাংশের মতো মান ভালো। অন্য দিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী গড়পড়তায় ভালো। দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য। এখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিতে হয় না। এসএসসি ও এইচএসসিতে প্রাপ্ত জিপিএ পয়েন্টের ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়। দুই পরীক্ষায় মোট ৬ জিপিএ পেলেও ভর্তি হওয়া যায়। এটা তেমন ভালো রেজাল্ট নয়। আমাদের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়ায় এরা গিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিড় করে। তারাও বেশি ছাত্র ভর্তি করতে কার্পণ্য করে না। এতে বেশি আয় হবে। তখন শিক্ষকদের বেতন দেয়া সহজ হবে, অন্যান্য ব্যয় মেটানো যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রাখতে হয় ক্লাস অনুযায়ী, শিক্ষার্থী অনুপাতে নয়। কোনো ক্লাসের ধারণক্ষমতা ৬০ হলে যত শিক্ষক রাখতে হবে, ২০ জন হলেও তাই। আবার ২০ জন ছাত্রের জন্য যদি পাঁচজন শিক্ষক রাখতে হয় তাহলে তাদেরকে দিয়ে ৬০ জনকেও পড়ানো যায়।

আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারিগুলোর মতো অসংখ্য বিষয় পড়ানো হয় না, চাহিদা-ভিত্তিক নির্দিষ্ট কিছু বিষয় পড়ানো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পড়ানো হচ্ছে বিবিএ। আমরা যতসংখ্যক ছাত্রকে বিবিএ পড়াচ্ছি তাদের দেশে কর্মসংস্থান করা যাবে কি-না সেটি ভেবে আমি শঙ্কিত। তা ছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিবিএ পড়ায়। এখানকার ছাত্রদের মান তুলনামূলকভাবে ভালো। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানও ভালো। ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এগিয়ে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ বিবিএ শিক্ষিত বেকার হয়ে দেশের বোঝা হবে কি না তা আমাদেরকে ভাবতে হবে। অথচ অন্যান্য বিষয়ের ছাত্র তত তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষক হিসেবে সব বিষয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। এখানে তো আইনেরও অনেক সুযোগ আছে। এরা পাস করে বার কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে স্বাধীন প্র্যাকটিস বা কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারে। সিএসই, ট্রিপল-ই, ইংরেজি, ফার্মেসি ইত্যাদি বিষয়েও প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছাত্র তৈরি হচ্ছে না। যেমন- আমরা ‘কমিউনিটি ফার্মেসি কনসেপ্ট’ ডেভলপ করার চেষ্টা করছি। ইউরোপ, আমেরিকা, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও ওষুধের দোকানে একজন ফার্মাসিস্ট রাখা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে এই ধারণা চালু হলে এখানে চার লাখ ফার্মাসিস্টের প্রয়োজন হবে। তখন এই বিষয়ে পড়–য়ারা সরকারি চাকরি না পেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যাবে। যারা সেখানে সুযোগ পাবে না তারা দোকানে যাবে। তাহলে আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান উন্নত হবে। কিন্তু এত ফার্মাসিস্ট আমরা তৈরি করতে পারছি না।

উন্নত দেশগুলোতে সরকারি বা বেসরকারি, যাই হোক না কেন, সাধারণত মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কোথাও ইচ্ছেমতো ছাত্র ভর্তি করার সুযোগ নেই। উচ্চ শিক্ষা তুলনামূলকভাবে মেধাবীদের জন্য। এদের সংখ্যা কম। মাস্টার্স ডিগ্রি পাস মানে ‘হাইলি কোয়ালিফাইড’। উন্নত দেশগুলোতে ‘এ’ লেভেল পাস করে ছাত্ররা জব মার্কেটে ঢুকে যায়। সেখানে মাস্টার্স ডিগ্রি করতে যাওয়া ছাত্র খুবই কম। যারা পিএইচডি করে তারা ‘টপ ক্লাস’ মেধাবী। সে কারণে আমেরিকার মতো দেশে পিএইচডি গবেষকদের ৮০ ভাগ বিদেশী। স্থানীয় পিএইচডিধারীদের মোটামুটি সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এরাই পিএইচডির সুপারভাইজার। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে এরা। এরাই জুডিশিয়ারি চালায়। উচ্চ শিক্ষার প্রতি আমাদের দেশে যে ধরনের মোহ আছে সেটি সেখানে নেই। এ দেশে উচ্চ শিক্ষার এই মোহ প্রকারান্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে।

উন্নত দেশগুলোতে কম মেধাবী ছাত্ররা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে চলে যায়। আমাদের দেশেও শিক্ষার্থীদের বেশি করে এরকম প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। এতে কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরি হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে ইচ্ছুক বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য মেকানিক্যাল, ইলেট্রিক্যাল ইত্যাদি ভোকেশনাল ট্রেনিং বা ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এরা শিক্ষিত বেকার হয়ে থাকবে না। এখন তো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই, ট্রিপল-ইর মতো বিষয়গুলোতে অনেক ডিপ্লোমাধারী ছাত্রকে দেখা যায়। এখানে তারা তিন বছরের অনার্স করছে। এটা ভালো দিক। যারা মেধাবী তাদের জন্য উচ্চ শিক্ষার পথ বন্ধ হচ্ছে না। আবার এরা সমাজের জন্য বোঝা হয়েও থাকবে না। এ জন্য সরকার টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বাড়াতে পারে। সেগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়াতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় তো আর ডিপ্লোমা পড়াতে পারবে না। দেশের পলিসি মেকারদের এ বিষয়ে ভাবতে হবে।

আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান একটি বড় সমস্যা। এমনভাবে কোর্স ডিজাইন করা হয় যেন শিক্ষার্থীরা খুব দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে তারা প্রকৃত অর্থে তেমন কিছু শিখতে পারে না। এই সমস্যার একটি অংশ হলো ‘স্লাইড সিস্টেম’। বিজ্ঞান, গণিতের মতো বিষয়গুলো ‘স্লাইড’ দিয়ে শেখানো যায় না। ভালো শিক্ষকতার অন্যতম গুণ হচ্ছে ‘চোখে চোখে যোগাযোগ’। ভালো পাঠদানের জন্য অবশ্যই শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর চোখে চোখে একটি যোগাযোগ থাকতে হবে। ‘স্লাইডের’ পাঠদান ছাত্রদের মন পাঠের গভীরে নিতে পারে না। এখানে ‘স্লাইড’ আগে থেকেই তৈরি করা থাকে। বারবার একই স্লাইড প্রেজেন্ট করা হয়। শিক্ষার্থীরা সেটি পায়। শিক্ষকরাও আর পড়াশোনা করেন না।

প্রতি সেমিস্টারে ‘স্লাইড’ হালনাগাদ করতে হলে শিক্ষককেও পড়াশোনা করতে হয়। নিয়ম হলো- শিক্ষকরা স্লাইড দিয়ে যা পড়াবেন তা ক্লাস শুরুর আগেই ছাত্রদের দিয়ে দিতে হবে। এতে তারা পাঠের প্রস্তুতি নিতে পারবে। ক্লাসে ‘স্লাইড’-এর পয়েন্টগুলো বুঝানো হবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে। কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্ন করার সময় অবশ্যই ওই স্লাইডের বাইরে থেকে করতে হবে। তাহলেই ছাত্র ছাত্রীরা কিছু শিখতে পারবে। এভাবে আমাদের এখানে পড়ানো হয় না। এখন ‘স্লাইডের’ বাইরে শিক্ষার্থীরা পড়ে না। ফলে পড়াশোনা অনেকটা সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। শিক্ষকরাও বাড়তি কিছু পড়াতে আগ্রহী হন না। এভাবে প্রতি বছর মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থী সমাজে তেমন অবদান রাখতে পারছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটভিত্তিক পড়াশোনাও একটি সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল-কলেজের মতো নয় যে, এখানে শিক্ষার্থীরা আসবে আর শিক্ষক ঘড়ি ধরে, পাঠ্যবইয়ের পাতা উল্টিয়ে পড়াবেন। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা। এ জন্য সেখানে তুমুল প্রতিযোগিতা থাকতে হবে, গবেষণা থাকতে হবে। সুসংগঠিত পদ্ধতিতে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জ্ঞানকে এগিয়ে নেয়াই হলো বিজ্ঞান। শুধু নিরেট বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা হবে এমন নয়। মানবিক বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, অর্থনীতি সব বিষয়েই গবেষণা হবে। সমাজে এসব গবেষণার প্রভাব পড়ে। এ জন্য গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। তাদেরকে পড়াশোনা করতে হবে। তারা নিবন্ধ লিখবেন, বই লিখবেন।

এভাবে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটাবেন। তারা জ্ঞান সৃষ্টি করবেন ও বিতরণ করবেন। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন কোনো বিষয়ের সুনির্দিষ্ট বই পাওয়া যেত না। একেকটি বিষয়ের ওপর তিনটি, পাঁচটি বই পড়তে হতো। তখন ফটোকপি মেশিনও ছিল না। আমরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বিভিন্ন বই থেকে খুঁজে নিয়ে হাতে লিখে নোট তৈরি করতাম। এভাবে পড়াশোনা করতাম। ওই ধরনের পড়াশোনা এখন সরকারি বা বেসরকারি- কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এখন শিক্ষক ক্লাসে যতটুকু পড়াচ্ছেন সেটুকুর ওপর ভিত্তি করেই পরীক্ষা নেয়া হয়। ছাত্ররা পরীক্ষা দিয়ে পাস করে।

আন্তর্জাতিকভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে দু’টি সেমিস্টার পড়ানো হয়। এগুলো হয় সাড়ে চার মাস করে। বাকি তিন মাস থাকে ফ্রি টাইম। এই সময় শিক্ষকরাও ফ্রি, ছাত্ররাও ফ্রি। তখন শিক্ষকরা অন্য কাজ করেন। লেখালেখি করেন। গবেষণা করেন। বই লিখেন, নিবন্ধ লিখেন। আমাদের এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসির মতো কয়েকটি বিষয়ের সেমিস্টার ছয় মাস করে। বাকিগুলোর চার মাস। বিরতিহীনভাবে একটার পর একটা সেমিস্টার। সেমিস্টারের তিন মাসের মাথায় পরীক্ষা। এরপর রেজাল্ট। নতুন সেমিস্টার শুরু। আবার পরীক্ষা। এভাবে চক্রাকারে চলছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার বাইরে আর কিছু চিন্তা করার সুযোগ নেই। সবাই যেন অপেক্ষায় থাকে, ১২ সেমিস্টার শেষ করে কখন সার্টিফিকেট হাতে পাওয়া যাবে। বড় কথা হচ্ছে- শিক্ষকরাও নিজেদেরকে আপগ্রেড করার সময় পাচ্ছেন না। সারা বছর ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকদের কোনো গবেষণা করার সুযোগ থাকে না। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন বছরে দুই সেমিস্টারের বেশি পড়ায় তার ব্যবস্থা নিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।

আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শিক্ষকদের ভালো বেতন দিচ্ছে। ভালো শিক্ষকও পাচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার উপযুক্ত হওয়ার পরও রাজনীতি বা অন্য কোনো কারণে বঞ্চিতরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসছেন। এদের একটি বিরাট অংশ মেয়ে। দুঃখের বিষয়, এখানে শিক্ষক ভালো কিন্তু ছাত্র খারাপ। ফলে খারাপ ‘পণ্য’ বের হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা ভালো হওয়ায় কিছু খারাপ শিক্ষক থাকলেও ছাত্ররা নিজেদের গুণেই ভালো করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ওই ধারা বজায় রাখতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও মেধাবীরা যাতে সেখানে আসতে পারে সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু নিজ বিশ^বিদ্যালয়ের ভালো ছাত্রকে নিয়োগ দিলে হবে না। এটা দীর্ঘমেয়াদে কুফল বয়ে আনবে। তখন দেখা যাবে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই সেখানকার শিক্ষক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের মান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের চেয়ে ভালো। অথচ এরা গবেষণা করার সুযোগ পান না। সারা বছর শুধু কোর্স শেষ করতে ব্যস্ত থাকেন। আমি মনে করি, দেশের মধ্যে হলেও বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত তাদেরকে এমএস, পিএইচডি করার সুযোগ দেয়া। এ জন্য তাদেরকে সবেতন ছুটি দিতে হবে। সপ্তাহে একটি বা দু’টি ক্লাস তারা নিতে পারেন। ভালো শিক্ষক তৈরির জন্য পিএইচডি গবেষণা প্রয়োজন। পিএইচডি করা মানে তিনি বুঝতে পারবেন গবেষণা কী। একে আমরা শিক্ষক প্রশিক্ষণ মনে করি। কিভাবে গবেষণা করতে হয় সেটি শেখাই আসলে পিএইচডি। তিন বছর গবেষণা করে কোনো পিএইচডি গবেষক তার পেপার সাবমিট করার পর তিনি অন্যের গবেষণা তত্ত্বাবধান করতে পারবেন। তাই শিক্ষকদের জন্য পিএইচডি জরুরি। কোনো শিক্ষক নিজে যদি গবেষণা না করেন তাহলে তিনি ছাত্রদের গবেষণা করাবেন কিভাবে? আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিএইচডি করানোর সুযোগ সরকার দেয়নি। তাই সেখানকার শিক্ষকদের পিএইচডি করার সুযোগ করে দিতে পারে সরকার। অনেকে মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করা প্রয়োজন। আমি তা মনে করি না। আমরা যারা শিক্ষক হয়েছি বা আমাদের যারা শিক্ষক ছিলেন তারা কখনো পড়ানোর জন্য ট্রেনিং নেননি। আবার কেউ খুব মেধাবী হলেই যে, তিনি ভালো পড়াতে পারবেন, সেটিও নয়। আমরা দেখেছি, অনেকে ভালো গবেষক, ভালো রিসার্চ করেন, ভালো পাবলিকেশন করেন কিন্তু ভালো পড়াতে পারেন না। কেউ ভালো পড়াবেন, কেউ ভালো গবেষণা করবেন। এটাই নিয়ম। ট্রেনিং দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো শিক্ষক তৈরি করা গেছে বলে আমার জানা নেই।

দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব তহবিল থেকে স্কলারশিপ দিয়ে শিক্ষকদের পিএইচডি করায় না। যারা পিএইচডি করেন তারা নিজ উদ্যোগে স্কলারশিপ জোগাড় করেন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের কোনো শিক্ষক পিএইচডি স্কলারশিপ পেয়ে থাকলে তাকে সবেতন ছুটি দিতে পারে। তবে শর্ত থাকবে যে, ওই সময় তিনি শুধু বেসিক পে পাবেন। পিএইচডি শেষে ফিরে এসে চাকরিতে জয়েন করার পর বাকি টাকা দেয়া হবে। এমন কিছু উদ্যোগ নেয়া গেলে আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভালো ছাত্র তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স এবং সাবেক ডিন ও অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

cmhasan@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category