• মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ০২:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
দেশে মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা ঠাকুরগাঁওয়ের আ’লীগ নেতার গোডাউনে ২৪০ বস্তা সরকারি চাল উদ্ধার, আটক-১ গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০০ চকরিয়ায় এসএসসি ব্যাচ’৯১ এর উদ্যোগে ঈদ পুনর্মিলনী সম্পন্ন মোংলা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষনা সভাপতি মোহন সাধারণ সম্পাদক দিদার চকরিয়ায় সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায় মামলা তুলে নিতে আদর বাহিনীর হুমকি, জিডি করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ! মোংলায় করোনা মোকাবেলায় দুস্থদের চাল দিলেন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার চকরিয়া পৌর এলাকায় কোচপাড়ায় পৈতৃক ভিটা জবর দখলে নিতে সন্ত্রাসী হামলা ঈদের দিনে ঠাকুরগাঁওয়ে সড়কে প্রাণ গেল তিনজনের সময়ের আগেই ঢাকায় শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল

রাণীশংকৈলে ৭১’র গণকবর বিলিন, ৩১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিস্তম্ভ ভূমিদস্যুদের কবলে

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা / ১৭৭ Time View
Update : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২০

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে ঐতিহাসিক খুনিয়া দীঘিতে ৭১ এর গণকবর বিলিন হতে বসেছে। সেই সাথে ৩১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে মুক্তযোদ্ধা স্মৃতি স্তম্ভ পুকুরে ধসে পড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।  স্বাধীনতার স্বাক্ষীগুলো সংরক্ষনে নেই কোন গুরুত্ব কর্তৃপক্ষের। এমন অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা।

জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের জন্য বরাদ্দ হয় খুনিয়াদিঘী পুকুর পাড়। সেখানে ৩১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ।

স্বাধীনতা বিরোধী একটি স্বার্থনেশি মহল পুকুরের পাড়সহ পুকুর ধারে অবৈধ ভাবে মাটি এবং বালি কাটায় পুকুরের ধারগুলি বন্যায় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে খুনিয়াদিঘী পুকুর পাড়ে থাকা খুনিয়াদিঘী স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ যে কোন মুহুর্তে পুকুরে ভেঙ্গে  পড়ার আশংকা রয়েছে। সেখানে রয়েছে ৭১তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে কয়েক হাজার শহীদের গণকবর। দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় এলাকার অসংখ্য নীরিহ বাঙ্গালীর উপর নির্মম, নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণহত্যা করে এ পুকুরে গণকবর দিয়েছিল পাক সেনারা।

সে সময় খুনিয়াদিঘী পুকুরের পানি দীর্ঘ দিন শহীদের রক্তে লাল হয়েছিল। কয়েক বছর পর পুকুরে শহীদদের হাড়, মাথার খুলি দেখতে পাওয়া যায়। হাড়গুলো সংগ্র করে পুকুর পাড়ে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে রেখে দেওয়া হয়, শহীদদের স্মৃতি হিসাবে। বললেন স্থানীয় শইফুল, আলহাজ্ব রিয়াজুল মাষ্টার ও মহুরী মঞ্জুর আলম।

মঞ্জুর আলম বলেন, দেশে যখন কার্ফুজারি হয় ঠিক সেই সময় যুদ্ধের প্রায় ১৫দিন আগে খানসেনারা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন অপারেটর কে প্রথম গুলি করে হত‍্যা করেছে খুনিয়াদিঘীতে । এরপর নেকমরদ করনাইট এলাকার রহমান চেয়ারম‍্যান ও সহমান ২ভাই, বড় বাশঁবাড়ী এলাকার ধনুদাফাদার, দক্ষিন সন্ধারই গ্রামের আমজাদ, ওসমান, হাকীমুদ্দীন, নয়ানপুর গ্রামের বিশু সহ অসংখ‍্য মানুষকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত‍্যা করেছে পাকসেনারা।

উপজেলার বলিদ্বারা নামক এলাকার এক কুমারী শ্রী টেপরী নামে এক যুবতিকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই হানাদার বাহিনী ক‍্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে টেপরীকে যুদ্ধ কালিন সময় ৯ মাস আটকে রাখে। টেপরী স্বাধীনতার জন‍্য ইজ্জত দিয়ে খান সেনাদের সাথে যুদ্ধ করেছে। নরপশুরা তারগর্ভে একটি সন্তান জন্ম দেয়। সেই সন্তানটি এখন অনেক বড় হয়েছে। স্বাধীনতার যুদ্ধের পর খানেরা টেপরিকে তার বাড়ীতে রেখে যায়। এত ঘটনার পরেও আত্মহত‍্যা করেনি সে। জীবন সংগ্রাম করে স্বাধীনতা স্মৃতি হিসাবে সন্তানটিকে সাথে নিয়ে বেঁচে আছে এই সমাজে। সাংবাদিককে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে এসব তথ‍্য জানালেন টেপরী। টেপরীর বর্তমান বয়স প্রায় ৫০/৬০ বছর। এধরনের হাজারো টেপরী স্বাধীনতাকে বুকে আকড়ে ধরে বেঁচে আছে স্বাধীন দেশে

২৬ শে মার্চ আসলে শহীদদের প্রতি ফুলদিয়ে শ্রদ্ধা সহ তাদের আত্নার মাগফেরাত কামনা করা হয় খুনিয়াদিঘী স্মৃতিসৌধে। সরকারী খুনিয়াদিঘী পুকুরটি স্বাধীনতা বিরোধী একজন ব্যক্তি কতিপয় ব্যক্তির জোগসাজসে নামে বেনামে দলিল করে ৭১তরের গণকবর বিলিন করছে বলে স্থানীয় সুসিল সমাজ সহ মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ।

জানা গেছে, রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডারা মৌজার জে,এল নং- ৮৯, খতিয়ান নং- ১, দাগ নং- ৩৭৭/১০৯১, জমির পরিমাণ ২.১৮ একর যা খুনিয়া দীঘি নামে পরিচিত। উক্ত জমি ভারত সম্রাট এর পক্ষে মালিকানা স্বত্বে জমিদারি পরগনা রাণীশংকৈল এর তৎকালীন জমিদার টংকনাথ চৌধুরী ওরফে টিএন চৌধুরী এর পুত্র কর্মনার্থ চৌধুরী মালিক ছিলেন। সিএস ৪৭৫নং খতিয়ানে আলোচ্য পুকুরটি ঐ উপজেলার মেহের বক্স সরকার এর পুত্র কুসুম উদ্দীনকে মাছ ধরা স্বত্বে জলকর আবাদ করার জন্যে তৎকালীন জমিদার তাকে অনুমতি দেয়। তবে শর্ত ছিল জমি অন্যত্রে বিক্রয় করা কিংবা হস্তান্তর করা নিষিদ্ধ  ছিল। ফলে কুসুম উদ্দীনের নামে এসএ খতিয়ান হলেও জমির পরিমাণ উল্লেখ্য না থাকায় তিনি জমির প্রকৃত মালিক নয় মর্মে জানা যায়। উক্ত পুকুরটি এসএ ১নং খতিয়ানে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের পক্ষে ডেপুটি কমিশনার দিনাজপুর এর নামে রেকর্ড ভুক্ত হয়।

পরবর্তীতে কুসুম উদ্দীন দিনাজপুর ডিসি বরাবরে রেকর্ড সংশোধনের ও জমির পরিমাণ নির্ধারন করার জন্যে ১৯৮২ সালে আবেদন করেন। আইনে স্বত্বের মোকদ্দমা বা প্রজাস্বত্ব বিধিমালা ৩৫ (২) ধারা অনুযায়ী রেকর্ড সংশোধনের ক্ষমতা জেলা প্রশাসক দিনাজপুর/অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে কোন ক্ষমতা অর্পণ করা হয়নি। এটি দেওয়ানি আদালতে অথবা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া স্বত্বেও অজ্ঞাত কারণে ১৯৮২ সালে দিনাজপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রাষ্ট্রের স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কুসুম উদ্দীন এর নামে বে-আইনী ভাবে রেকর্ড সংশোধন করেন। বিভিন্ন সময়ে সরকারি জরিপে উক্ত প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পত্তি সরকারি খাস খতিয়ানে সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ড ভুক্ত হয়েছে। যাহার সকল কাগজ পত্র রাণীশংকৈল উপজেলার ভূমি অফিস ও ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংরক্ষণ রয়েছে।

এ পুকুরটিতে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্মৃতি বিজরিত থাকলেও এলাকার কিছু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিদের কারনে উক্ত সরকারি সম্পত্তি সরকারের হাত থেকে বে-দখল হয়ে স্মৃতি নষ্ট হয়েছে। জমি ও পুকুরটি বিক্রয় করা ও হস্তান্তর করা নিষিদ্ধ থাকলেও শর্ত ভঙ্গ করে ইতিপূর্বে কুসুম উদ্দীন ৯৬০১নং দলিল মুলে তার পুত্র হামিদুল এর কাছে উক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করেছেন। হামিদুরের কাছ থেকে উক্ত জমি সহ জলকরটি গত ০১/০৯/২০১৬ ইং তারিখে মোস্তফা আলম তার বোন সুরাইয়া বেগমের নামে ক্রয় করে।

বর্তমানে রাণীশংকৈল সাব-রেজিস্টার অফিসের নকল নবিস মোস্তফা আলম অরফে মদন ঐ পুকুরে মাছ চাষ করছেন এবং ৭১ এর গণকবরকে কোন গুরুত্ব না দিয়েই তিনি উক্ত পুকুরে মাছ চাষ করে স্মৃতি নষ্ট করা সহ অবৈধ ভাবে বছরে প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এমন অভিযোগ করেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা সহ রাণীশংকৈল বাসী।

মোস্তফা আলম রাণীশংকৈল ভূমি অফিসের নকল নবিস হলেও দূর্নীতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার নামে বেনামে সম্পত্তির মালিক হওয়া, সরকারি পুকুর দখল করা এবং অসংখ্য দলিল জালিয়াতির ঘটনার সাথে জড়িত থাকায় তার বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক মামলা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ব্যাপারে রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী আফরিদা জানান, উক্ত পুকুরের সমস্ত জমি খাস খতিয়ান ভুক্ত ও সরকারি সম্পদ। তিনি বলেন, সম্প্রতিক পুকুরের যাবতীয় তথ্যাবলি লিখিত আকারে জেলা প্রশাসক ঠাকুরগাঁও মহোদয়ের দপ্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হবিবর রহমান বলেন, লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র পেয়েছি। রাণীশংকৈল খুনিয়াদিঘীটি বহন করছে লাখ শহিদের স্মৃতি। যা বিলিন করতে বসেছে একটি স্বাধীনতা বিরোধী চক্র।

সাবেক এমপি সেলিনা জাহান লিটা বলেন, লাখ শহীদের স্মৃতি খুনিয়াদিঘী টি যদি কোন ব্যক্তি অবৈধ ভাবে দখল করে থাকে তা যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্ধারের ব্যবস্থা করে।

এ ব্যাপারে ভূমি দস্যু মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন তথ্য দিবেন না বলে জানান। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকার সচেতন মহল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category