মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০১:০৮ পূর্বাহ্ন

সাহসীকাদের স্বাবলম্বিতার আলোকছটা, চকরিয়া নারী উদ্যোক্তামেলা

বিবিসি একাত্তর ডেস্ক
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০২৪
  • ২২৬ Time View
বদরুল ইসলাম বাদল
————————
প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে সমাজ,বৃদ্ধি পাচ্ছে  শিক্ষিত মানুষের,মানুষ সভ্য হচ্ছে তবে  সমানতালে
বেড়ে চলছে অসভ্যতাও।বর্তমান  সমাজকে যতই আধুনিক দাবি করা হোক না কেন,  এখনো বহু খারাপ রীতিনীতির প্রচলন  রয়েগেছে, যার মূলোৎপাটন নাহলে তার ক্ষতিকর প্রভাব সমাজ পরিবর্তনকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।দেখা যায় বিভিন্নভাবে  নির্যাতিত হচ্ছে নারীসমাজ।যা সভ্যতার জন্য  কলংকের।নারী উন্নয়নে  সামাজিক নিরাপত্তায়  যৌতুকমুক্ত সমাজ, বাল্যবিবাহ মুক্ত দেশ দেখার সপ্ন নিয়ে  অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল  মনে করেন , “যে কোন নারীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হচ্ছে তার কাছে কিছু টাকা থাকা”।নারীদের স্বাবলম্বিতা নিয়ে করোণা পরবর্তী  চকরিয়ার মতো উপশহরে নারী উদ্যোগক্তাদের অভিষেক  নারী উন্নয়নে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়।তাদের কর্মতৎপরতা জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। প্রতিবছরের মতো এবছর ফেব্রুয়ারিতে নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে  দুইটি মেলা অনুষ্ঠিত হয় চকরিয়া বিজয়মঞ্চ প্রাঙ্গণে। মেলা দুটো সফল হয়েছে  দাবী চকরিয়া হস্তশিল্প ও দেশীয় পন্য উৎপাদনমূখী সমবায় সমিতি লিমিটেড   এবং আত্মপ্রত্যয়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের।তবে  একই জায়গায় দুই দিনের ব্যবধানে আলাদা আলাদা   মেলা আয়োজনকে সমর্থন করতে পারছে না, নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আশাবাদী সচেতন অনেক বিশিষ্টজনেরা।তাদের ভাষ্যমতে দুই গ্রুপ যৌথ ভাবে  আয়োজন করতে পারলে মেলাটি আরও গুরুত্ববহ হতো,সমালোচনার উর্ধ্বে থাকতো। গ্রুপ ভিত্তিক দ্বন্দ্বের চাপ থেকে নেতিবাচক প্রভাব মুক্ত থাকতো সাধারণ  সদস্যারা।যেকোন  কর্মজীবী  মহিলা পরিবারের শতভাগ  সমর্থন পাওয়ার মত সামাজিক পরিস্থিতি এখনো  তৈরি হয় নাই এই উপশহরে। সাংসারিক কাজ সামাল দিয়ে  অনেক বাধা অতিক্রম করে কাজে বের হতে হয়। এই দ্বন্দ্বটি অনেক পরিবারের মুরুব্বিদের কাছে  বাঁধা সৃষ্টির মুখ্য হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হতে পারে, এমনও ধারণা অনেকের। উদার রক্ষণশীল সমাজে আমাদের বেড়ে উঠা,তবে  মহিলাদের বাইরে কাজ করা নিয়ে আমাদের  মানষিক বিকাশ পর্যাপ্ত নয়। অপ্রিয় হলেও সত্য যে,সমাজে বিভিন্ন ভাবে  নারীরা  অবহেলিত।বিভিন্ন কারণে অনেকের ঘর সংসারে ফাটল ধরে,ভেঙ্গে যায়।তখন অনেকের জীবনধারণের কোন উপায় থাকে না।কাজ খুঁজে পায় না।অনেক পরিবারে বহু মেধাবী মেয়েরা বাবার দারিদ্রতার কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে না। থমকে যায় জীবনের গতি।তখনই দরকার পড়ে কাজের।উপায় না পেয়ে কেউ যায় গার্মেন্টসে, কেউ ছোটখাট অন্য কাজে। জীবনের সাথে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করে।সেখানেও পদে পদে প্রতারণা প্রবঞ্চনার স্বীকার হয়ে পড়ে।  লেখাপড়া জানা অনেকেই উপযুক্ত  পেশা পায় না,তখন  হতাশা নেমে আসে জীবনে।সেই সময়টাতে  অনুভব করে একটি হাতের কাজ জানা হলে ভাল হয়।  চকরিয়া হস্তশিল্প সমিতি এবং আত্মপ্রত্যয়ী নারীদের  স্বাবলম্বি হওয়ার পথপ্রদর্শক হয়ে কাজ করছে।সেইজন্য তাদের কার্যক্রমকে  সাধুবাদ জানিয়ে আরো বৃহত্তর পরিসরে অগ্রগতি কামনা করে সচেতন মহল।  যখনই সফল  নারীদের  নিয়ে গল্প উঠে তখনই আমরা বেগম রোকেয়া,বিবি রাসেল,কানিজ আলামস খান সহ সাফল্যগাথা  ভাইরাল হওয়া আরো অনেক নারীদের কথা বলে থাকি।অন্যদিকে আমাদের চকরিয়াতেও অনেক নারী উদ্যোক্তার কথা বলা যেতে পারে, যাঁরা এই জনপদের জন্য সত্যিই  গর্বের এবং সন্মানের। আমরাও বলতে পারি আমাদের  শারমিন জান্নাত ফেন্সির কথা,জিনিয়া মুছার কথা,ফাতেমা বেগম রাণী, তানিমা কবির সহ  অনেকের ।দেশসেরা নারীদের মতো  তাদেরও বলার মতো  আলাদা  গল্প  আছে,লড়াইয়ের কাহিনী রয়েছে।নিজের পরিবার এবং  সমাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে তাদের আজকের বর্তমান ।আমরাও গর্ব করতে পারি জিনিয়া মুছা, শারমিন জান্নাত ফেন্সি সহ  অন্যান্যদের  নিয়ে।একজন জিনিয়া মুছা  চকরিয়া উপজেলার মতো উপশহরে সপ্ন দেখছেন গার্মেন্টস কারখানা স্থাপন  করার। যেখানে হাজার  মহিলা কাজ করবে, অনেকে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেদের মেধা এবং প্রজ্ঞাকে লাগানোর সুযোগ পাবে।পারুক কিংবা নাইবা পারুক জিনিয়া মুছা চকরিয়াতে গার্মেন্টস করার স্বপ্ন দেখছেন, দেখাচ্ছেন, তাও কম প্রাপ্তি কিসের? তার দেখানো  পথ বেয়ে হয়তো অন্য কারও হাত ধরে চকরিয়াতেই হবে নারীদের উদ্যোগে গার্মেন্টস,আশাবাদী আমরা।জিনিয়া মুছা  এবং তার সংগঠন আত্মপ্রত্যয়ী ধারাবাহিক ভাবে নারীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে  আসছেন। অন্যদিকে জীবনের সাথে লড়াই করে স্বাবলম্বী হওয়ার মিশিলে আলো ছড়াচ্ছেন শারমিন জান্নাত  ফেন্সি। বিলুপ্ত প্রায় হাতের কাজ সহ সৃজনশীল অনেক কাজ নারীদের হাতে  তুলে দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার আশার আলো দেখাচ্ছে। এভাবে উভয় সংগঠনের অনেক সফল নারী উদ্যোক্তার  কথা বলা যেতে পারে।নারীরাও পারে এমন গল্পে আমাদের এলাকার নারীরাও এগিয়ে।তাঁরাই যুগ যুগ ধরে  সমাজ বিনির্মানের  স্থপতি।নজরুলের ভাষায়, “পৃথিবীর যাহা কিছু চির মহান- কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”।ইতিহাস সাক্ষী যুগে যুগে  নারীদের সাহচর্য ও প্রেরণায় অনেক পুরুষের সাফল্যের কথা । অন্যদিকে পুরুষের সহযোগিতা পেলে নারীরাও  যেতে পারে অনেক দুর।এনিয়ে হস্তশিল্প সমিতির সভাপতি শারমিন জান্নাত  ফেন্সির একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস এখানে  উল্লেখ করা যেতে পারে।তিনি তার স্বামী সাংবাদিক মনসুর মহসীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখেন যে,” মনসুর মহসীন তোমার মত জীবন সঙ্গী পেয়ে সত্যি আমি ধন্য।তোমার মতো মানুষ পাশে আছে বলেই আমার অনেক কঠিন কাজও সহজ ভাবে হয়ে যায়”।অন্যদিকে জিনিয়া মুছার স্বামী আওয়ামী লীগ উপজেলা সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে , তার শত ব্যস্ততার মাঝেও স্ত্রী জিনিয়াকে সাহস ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এমনিভাবে যদি আমাদের উপশহরের সমস্ত  উদ্যোক্তাগণ  পারিবারিক সমর্থন পেয়ে থাকে, তখন আমরাও হয়তো  পেতে পারি একজন বিবি রাসেল । ঢাকার মেয়র বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আনিসুল হকের  ভাষায়,  মানুষ তার  স্বপ্নের চেয়েও বড়।আমি ও তাই বিশ্বাস করি। আমিও তাই বলবো, সপ্ন দেখ,সপ্ন দেখা বন্ধ করো না”।তিনি প্রতিটি কাজকে শতভাগ ভালবাসা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে করার পরামর্শ দিয়ে টাইম ম্যানেইজমেন্টের উপর সর্বাধিক গুরুত্বের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।উন্নয়নের সাফল্যের সূত্রে  নোবেলজয়ী মার্গারেট তেরেসার একটি উক্তি এখানে  সংযোজন করতে পারি ” তুমি যদি কিছু বলতে চাও পুরুষদের দিয়ে বলাও, যদি কোন কাজ সম্পন্ন করতে চাও,নারীকে দিয়ে করাও”।যতই জটিল সমস্যা হোকনা কেন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে  গঠনমূলক সমাধান সম্ভব, শুধু দরকার ধৈর্য্য, সহনশীলতা সহমর্মিতা এবং সার্বজনীন চিন্তা।বিভক্ত নারী উদ্যোক্তাগণ যৌথভাবে একই মঞ্চে তাদের প্রদর্শনী নিয়ে আসলে  সবচেয়ে উপকৃত হবে নারীসমাজ,যা উভয়ের প্রধান এজেন্ডা।তখন  ডাবল খরচের পাশাপাশি প্রশাসনিক খরচও অর্ধেকের বেশি বেঁচে যাবে।এপর্যায়ে ধৈর্য্য, সহনশীলতা এবং আত্মোপলব্ধি নিয়ে  বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান এইড এর মহাসচিব সহেলী পারভীন এর এই উক্তিটির গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসলে সমাধান অনেক সহজ হবে মনে করি।যেমন, “নারীরাই নেতৃত্ব দিতো পৃথিবীর, যদি গর্ভধারণের সমান ঝুকি আর প্রসবের সমান বেদনা সহ্য করার মানসিকতা ও ধৈর্য্য রাখতে পারতো, সকল কাজেও মানবতার জন্য”।অন্যদিকে সচেতনতা সৃষ্টি হল দীর্ঘমেয়াদী চলমান প্রক্রিয়া, যা একদিনে সব কিছু করা সম্ভব নয়।সবাই নিজনিজ অবস্থান থেকে ভাইরাল হওয়ার চেষ্টায় থাকলে ভবিষ্যৎ এই সব লোক দেখানো কাজে জনসাধারণের অনাগ্রহ জন্মাবে।বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী বদরুন নাহার কলি তাঁর বিশ্লেষক মন্তব্যে বলেছেন যে,”উপজেলা পরিসরের ছোট্ট আয়োজনকে ভাগ না করে একসাথে করতে পারলে আরও আলো ছড়াতো বেশি, আমার ধারণা এমনই । বৃহত্তর স্বার্থে আমরা  নিজের ইগো ত্যাগ করবো  ইনশাআল্লাহ।তাতে আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সফলতা আসবে বেশী”।চকরিয়া থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক মাতামুহুরি এবং চকরিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিজবাহ উল হক জোরালোভাবে যৌথ নারী উদ্যোক্তা মেলার  পক্ষে মতামত তুলে ধরে বলেন, “প্রতিযোগিতা হোক উৎপাদনমূখী,সচেতনতা মূলক।ফলে আগ্রহ বাড়বে ব্যাপক নারীদের”।দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত রাখতে  নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি বেসরকারি সকলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তারাই আলোকিত করবে সমাজ ও পৃথিবীর।আগামী নারী উদ্যোক্তামেলা যৌথ এবং সবারই  অংশগ্রহণে প্রানবন্ত হয়ে উঠবে আশাবাদ সামাজিক আন্দোলনের সাথে জড়িত অভিজ্ঞ মহলের।স্বনামধন্য  শিক্ষক অধ্যাপক আ ক ম গিয়াস উদ্দিন মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “যদি লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এক অভিন্ন হয়, যৌথ আয়োজন নয় কেন? কোন সমস্যাই সমস্যা নয়,যদি তা সঠিকভাবে সমাধান করা যায়।আমাদের সেই লক্ষ্যেই অগ্রসর হতে হবে”।
————————
বদরুল ইসলাম বাদল
কলামিস্ট এবং সমাজকর্মী।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো ক্যাটাগরি
© All rights reserved © 2024 bbcekottor.com
Technical suported by Mohammad Iliych