করোনায় কর্মীদের উপর কি অমানবিক হবে প্রথম আলো?

বিবিসি একাত্তর বিবিসি একাত্তর

প্রকাশক বিবিসি একাত্তর

প্রকাশিত: ৭:২৮ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

মাইনউদ্দিন হাসান শাহেদ
সাবেক প্রথম আলো কর্মী
২৯ জুন/২০২০ইং

করোনায় দেশের সব ব্যবসা প্রতিষ্টান ক্ষতিগ্রস্ত তাতে কোন সন্দেহ নেই। এতে প্রতিষ্টানগুলো কর্মীদের বেতন দিতে না পেরে চাকরি থেকে ছাঁটাই করছেন। চাকরি হারার এই খড়গ সংবাদপত্রেও নেমে এসেছে। কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রথম এই কাজটি নাকি শুরু করতে যাচ্ছেন দেশের প্রধান দৈনিক প্রথম আলো। সবচেয়ে লাভজনক পত্রিকাটি তিনমাসও কর্মীদের হজম করার শক্তি দেখাতো পারলো না। এ ঘটনাটি সংবাদকর্মীদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

দেশের ইতিহাসে সংবাদপত্রকে শিল্পে রূপ দিয়েছিল প্রথম আলো। এ শতকের শুরুতেই অল্প সময়ে এ পত্রিকা সংবাদপত্র জগতে বড় পরিবর্তন এনেছিল। যা ইতিহাসও বটে। সারাদেশের একঝাঁক উদ্যোমী, সাহসী,প্রতিশ্রুতিশীল ও সৎ সাংবাদিকের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম এ পত্রিকাকে উঁচু মাত্রায় তুলে আনার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। দেশের এই স্বপ্নচারীদের দলের প্রধান প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা ও আঞ্চলিক অফিসগুলোও ছিল একেকটি পরিবার।

১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর দেশের প্রভাবশালী এ দৈনিকটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতেই হু হু করে বেড়ে চলে প্রচার সংখ্যা। বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশ সাংবাদিকতা নীতিমালায় অনড় পত্রিকাটি রেকর্ড পরিমাণ পাঠকপ্রিয়তা পায়। দেশে অতীত ইতিহাসে এতদ্রুত কোনো সংবাদপত্র এভাবে শীর্ষে উঠে আসার ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। স্বাভাবিকভাবে দেশের রাজনীতি,সমাজনীতি ও অর্থনীতিতে পরিবর্তনে বড় প্রভাব পেলে পত্রিকাটি। একটা সময় ছিল দেশের কোনো একটি খবর বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিতের জন্যে প্রথম আলোয় পাঠকের ভরসাস্থল ছিলো।

যারা বা যাদের দিয়েই পত্রিকাটির আজকের অবস্থান তারা সেখানে বেশিদিন ঠিকতে পারেনি। ভাঙন শুরু হয় পত্রিকার অভ্যন্তরে। কিছু অযোগ্য ও তেলবাজ কাগজটির থরে থরে বসে যায়।ফলে অনেক মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক নানা ভাবে চাকরিচ্যুত হয়েছেন কিংবা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।যা হয়তো স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করা যাবেনা।

গতকাল শনিবার আমার দুই সাবেক সহকর্মী প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার শরিফুল হাসান ও সিনিয়র সাব এডিটর নাসির উদ্দিন হায়দার তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রথম আলোর কর্মী ছাঁটাইয়ের ব্যাপারে বিশদভাবে লিখেছেন। যা পড়ে রীতিমতো হতবাক হলাম। তথ্য মতে, এক তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁড়াই করা হবে। আজ ২৯জুনের মধ্যে দেশের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকেও ছাঁটাইকৃত কর্মীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে ব্যবসা সফল এ কাগজটিতে যদি কর্মী ছাঁড়াই করা হয়, তাহলে অন্য গনমাধ্যমও এই পথে হাঁটতে পারে বলে আশংকা রয়েছে। যা সংবাদকর্মীদের জন্য অশনি সংকেত। করোনার এই মানবিক বিপর্যয়ে প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক মতি ভাই এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবেন সেটাই চান আমার এই দুই সাবেক সহকর্মী। আমিও চাই কাউকে চাকুরিচ্যুত না করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সংকট মোকাবেলা করা হোক।

দেশের সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের পেছনে মতি ভাইয়ের বিশাল অবদান রয়েছে। আবার কালোটাকার মালিকদের পত্রিকা বের করার পেছেনেও প্রথম আলোকেই কেউ কেউ দায়ী করে থাকেন। কারণ বেশির ভাগ সময়ে দেখা গেছে প্রথম আলো হাউস থেকেই একটি দল বের করে নতুন পত্রিকার জন্ম দেওয়া হয়েছে।

আমার দেখামতে, ২০০৬ সালের পর থেকে আমাদের সেই সাংবাদিকতার স্বপ্নদ্রষ্টা মতি ভাই বদলে যেতে থাকেন। তার এই বদলে যাওয়ার মধ্যে অনেকেই বলী হয়েছেন। নানা অজুহাতে সারাদেশের প্রতিনিধিদের ছাঁটাই করা হয়েছে। ঢাকা অফিসেরও অনেক সিনিয়র সাংবাদিক পত্রিকা ছেড়ে চলে গেছেন। একই ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম অফিসসহ আঞ্চলিক অফিসগুলোতে,যদিও এসব ঘটনায় ভেতরের অনেক পলিটিক্সও আছে। আজ হয়তো যারা এসব পলিটিক্স করে অন্যদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছেন, তাদের হয়তো কেউ কেউ এখন চাকরিচ্যুতির জন্য অপেক্ষায় আছেন।

যাই হোক, দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হওয়ার ফলে সবকিছু পাবলিকলি বলা উচিৎ বলে মনে করছি না। আমি এ পত্রিকায় প্রায় ১৩বছর কাজ করেছি। সাংবাদিকতা জীবনের বেশিরভাগ সময় এখানেই কেটেছে। আমাদের সময়ে কিছু নিয়ম কানুন ছিলো। এখন নিয়মগুলোর কি অবস্থা জানিনা। তবে শুনেছি আগের মতো নাকি বেশি কড়াকড়ি নেই। প্রথম আলোর সাংবাদিকরা কোনো সাংবাদিক সংগঠন বা প্রেস ক্লাবে যুক্ত থাকতে পারবেন না। পাশাপাশি অন্য কোন পেশা বা মিডিয়ায় জড়িত থাকা যাবেনা। ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ম নীতি।

অথচ এতসব নিয়ম নীতির একটি হাউসে একজন কর্মীকে ছাঁটাই করতে কোন নিয়ম মানা হয়েছে বলে আমার জনা নেই। দীর্ঘ একযুগ দেড়যুগ কাজ করা একজন প্রতিনিধিকে বলে দেওয়া হলো,কাল থেকে আপনাকে আর সংবাদ পাঠাতে হবেনা। মানে আপনার চাকরি নেই। এই আচরণ দেশের অনেক জেলা উপজেলা প্রতিনিধির সঙ্গে করা হয়েছে। এভাবে পৌনে ২২ বছরে বেশিরভাগ পুরোনো কর্মী প্রথম আলো থেকে ছাঁটাই হয়েছেন। আর শেষ পরিনতির শিকার হয়তো করোনা কালেই ঘটতে যাচ্ছে!