• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন

প্লাস্টিকের ড্রামে বেঁচে ফিরলেন রফিক!

নিজস্ব প্রতিনিধি / ২৩ Time View
Update : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

টেকনাফ বন্দরে ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজের স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন উখিয়ার ৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যুবক রফিকুল ইসলাম (২৭)। কিন্তু সেই স্বপ্ন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রূপ নেয় দুঃস্বপ্নে। কাজের প্রলোভনে তাকে আটকে রাখা হয় অন্ধকার গুদামে, এরপর রাতের আঁধারে তুলে দেওয়া হয় মালয়েশিয়াগামী এক ‘মৃত্যু-তরীতে’।

আন্দামান সাগরে সেই ট্রলারডুবির ঘটনায় ২৮০ জন যাত্রীর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনের একজন হিসেবে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। প্লাস্টিকের ড্রাম ধরে দুই দিন এক রাত উত্তাল সাগরে ভেসে থাকার সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতায় এখন শিউরে উঠছেন রফিকুল।

উখিয়ার ক্যাম্প-৬, এ-৫ ব্লকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, গত ২ এপ্রিল ক্যাম্পের এক পরিচিত যুবক তাকে টেকনাফ বন্দরে ভালো বেতনে কাজের টোপ দেয়। প্রতিদিন ৬০০ টাকা মজুরির আশায় সেদিন বিকেলেই ঘর ছাড়েন তিনি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে টেকনাফ পৌঁছানোর পর দালালেরা তাকে একটি গুদামঘরে নিয়ে আটকে রাখে।

রফিকুল বলেন, ‘আমাকে টেকনাফের রাজারছড়া গ্রামের ভেতরে একটি বাড়িতে রাখা হয়েছিল। সেখানে আমার মতো আরও অনেককে বন্দি করে রাখা হয়। কাজের কথা জিজ্ঞেস করলেই দালালেরা মারধর করত। সারাদিনে মাত্র একবার সামান্য খাবার দেওয়া হতো।’

এরপর শুরু হয় আসল পাচার প্রক্রিয়া। রফিকুল জানান, রাতের অন্ধকারে বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে বিজিবি ক্যাম্পের নজরদারি এড়িয়ে ১০ থেকে ২০ জন করে ছোট ট্রলারে তোলা হয়। সমুদ্রের চামেলী এলাকায় অপেক্ষমাণ একটি বড় ট্রলারে তাদের সবাইকে স্থানান্তর করা হয় রাত ৯টার দিকে। সব যাত্রী তোলা শেষ হলে রাত ১২টায় ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

রফিকুলের দেওয়া তথ্যমতে, সেই ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন মানুষ ছিল। যার মধ্যে ২৪০ জন পুরুষ, ২০ জন নারী, ৪ জন শিশু এবং ১৩ জন ট্রলারের স্টাফ বা দালাল চক্রের সদস্য। ট্রলারে খাবার ও পানির সংকট ছিল চরম। দিনে মাত্র দুবার সামান্য খাবার এবং যৎসামান্য পানি দেওয়া হতো।

নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে রফিকুল বলেন, ‘ট্রলারে কেউ পানি চাইলে বা শব্দ করলে দালালরা তাদের ট্রলারের নিচের গোপন কক্ষে ঢুকিয়ে দিত। মাছ বা বরফ রাখার সেই চারটি কক্ষে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ জন রাখা যায়, কিন্তু দালালরা একেকটিতে ৪০ জন করে ঢুকিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দিত। ৭ এপ্রিল রাত ২টার দিকে পানির জন্য প্রতিবাদ করায় আমাদেরও সেই গোপন কক্ষে ঢোকানো হয়। ভেতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না, অক্সিজেনের অভাবে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। পরে তিনটি কক্ষ খুলে দেখা যায় ৩৩ জন মারা গেছেন। দালালরা সেই লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।’

লাশগুলো সাগরে ফেলার প্রস্তুতির মধ্যেই শুরু হয় প্রকৃতির তাণ্ডব। ৭ এপ্রিল গভীর রাতে আন্দামান সাগরের কাছে পৌঁছালে ট্রলারটি বড় বড় ঢেউয়ের কবলে পড়ে। রফিকুল বলেন, ‘ঢেউয়ের ধাক্কায় ট্রলারে পানি ঢুকতে শুরু করে। একপর্যায়ে একটি দানবীয় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি পুরোপুরি উল্টে যায়। আমি প্রায় এক ঘণ্টা ট্রলারের একটি অংশ ধরে ঝুলে ছিলাম, কিন্তু সেটিও একসময় তলিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় সাগরে আমার একা ভেসে থাকা।’

রফিকুল জানান, সাগরে ভাসমান অবস্থায় তিনি চারদিকে শুধু মৃতদেহ দেখতে পাচ্ছিলেন, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিথর দেহগুলো ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাচ্ছিল। প্রায় দুই দিন এক রাত সাগরে ভেসে থাকার পর আরও কয়েকজনের দেখা পান তিনি। চারজন মিলে একটি বড় প্লাস্টিকের ড্রাম বা ভাসমান বস্তু আঁকড়ে ধরে সাহায্য চান। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে এবং কোস্টগার্ডের হাতে তুলে দেয়।

বেঁচে ফিরলেও রফিকুলের শরীরে এখনো রয়ে গেছে দালালের নির্যাতনের চিহ্ন এবং দগ্ধ হওয়ার ক্ষত। ট্রলারডুবির আগে তাকে ইঞ্জিনের পাশে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। দুর্ঘটনার সময় ইঞ্জিনের গরম তেল তার শরীরে পড়ে চামড়া ঝলসে যায়।

তিনি বলেন, ইঞ্জিনের তেলের জ্বালায় শরীর পুড়ে যাচ্ছিল, তার ওপর নোনা পানিতে পড়ার পর সেই জ্বালা অসহ্য হয়ে ওঠে। ট্রলারে আমাদের ওপর পশুর মতো আচরণ করা হতো। আমাকে কোমরে বেল্ট আর কাঠের টুকরো দিয়ে পেটানো হয়েছে। শুধু আমি নই, প্রতিটি যাত্রীকে তারা নির্মমভাবে মারধর করত।’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান এই ঘটনার জন্য দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট ও প্রত্যাবাসন না হওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিগত নয় বছরেও কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি, উল্টো নতুন করে রোহিঙ্গা আসছে। এই হতাশাজনক পরিস্থিতিই তাঁদের বিপজ্জনক পথে পা বাড়াতে বাধ্য করছে। সাগর এখন উত্তাল, এই সময়ে কাঠের নৌকায় যাত্রা আত্মঘাতী।’

তিনি আরও বলেন, সরকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে আছে এবং জড়িত পাচারকারীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন আটক হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আন্দামান সাগরের সেই ট্রলার ডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় দুই শতাধিক মানুষের পরিণতি কী তা এখনো অজানা।

সূত্র: সময় নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা