রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বিভিন্ন মিডিয়ার ১০ জন সাংবাদিক। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্য। হামলাকারীরা সবাই ঢাবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনার পর আজ শুক্রবার দুপুরে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও সনদপত্র বাতিলের দাবিতে উপাচার্য বরাবর অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)। অভিযোগপত্রে মোট ১২ জন হামলাকারীর নাম, বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ, আবাসিক হল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছিল। আজ শুক্রবার বিকেলের মধ্যে হামলাকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের আলটিমেটাম দেন সাংবাদিকরা। সাংবাদিক সমিতির দাবিসমূহ হলো- হামলায় জড়িত সকল শিক্ষার্থীকে অবিলম্বে বহিষ্কার করতে হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাদের স্থায়ী বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে; যে সকল হামলাকারীর ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে (স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন) তদন্তসাপেক্ষে তাদের সনদপত্র বাতিল করতে হবে এবং উল্লিখিতদের বাইরে হামলায় আরও বেশ কয়েকজন জড়িত ছিল। তাদের পরিচয় শনাক্ত করে তাদেরও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে। এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমি এ ঘটনার জন্য আপনাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। যারা এ ঘটনার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। তাৎক্ষণিকভাবে দুইটা কমিটি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করব। ১২ ছাত্রদল নেতাকর্মীর পরিচয় অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীদের মধ্যে রয়েছে-ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম আল নাসের মিশুক (ইইই বিভাগ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, শিক্ষাবর্ষ ২০১৩–১৪, রেজিঃ ২০১৩৪১২৩৮৬), হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুজার গিফারী ইফাত (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০১৮–১৯, রেজিঃ ২০১৮১২৪৮৯৫), হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনসুর রাফি (জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০১৮–১৯, রেজিঃ ২০১৮২২৭৩৯৬), মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য কারিব চৌধুরী (গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০২৩–২৪, রেজিঃ ২০২৩২১৪০০৬), মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য জাহিন ফেরদৌস জামি (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০২১–২২, রেজিঃ ২০২১৬১৩১৭৭), শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মমিতুর রহমান পিয়াল (ক্রিমিনোলজি বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০২২–২৩, রেজিঃ ২০২২৭১২৮১৫), লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের সানিন সায়েদ (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, শিক্ষাবর্ষ ২০২২–২৩, রেজিঃ ২০২২৬১৭৭৪৯), ডাকসু নির্বাচনে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদে ছাত্রদল মনোনীত সদস্য পদপ্রার্থী সানিন সায়েদ (লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, শিক্ষাবর্ষ ২০২২–২৩, রেজিঃ ২০২২৬১৭৭৪৯), বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা সুলায়মান হোসেন রবি (আইন বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০২২–২৩, রেজিঃ ২০২২২১২০৯০), বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা সাজ্জাদ হোসেন (ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০১৮–১৯, রেজিঃ ২০১৮৭২৪৯৪৩), শহীদুল্লাহ হলের সদস্যসচিব জুনায়েদ আবরার (ইইই বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০২২–২৩, রেজিঃ ২০২২১১৬০৩৩), সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত (উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০১৮–১৯, রেজিঃ ২০১৮২২৩০৬৬), এবং বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদল নেতা সাঈদ হাসান সাদ (সংস্কৃত বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ২০২২–২৩, রেজিঃ ২০২২১১৭৬১৮)। এরমধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনের অনুসারী কারিব চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ইমাম আল নাসের মিশুক, আবুজার গিফারী ইফাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহসের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মনসুর রাফি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সুলায়মান হোসেন রবি ও সাজ্জাদ হোসেন। ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের অনুসারী মনোয়ার হোসেন প্রান্ত। সমিতির তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার হন মানজুর হোছাঈন মাহি (কালের কণ্ঠ), লিটন ইসলাম (আগামীর সময়), নাইমুর রহমান ইমন (ডেইলি অবজারভার), খালিদ হাসান (দেশ রূপান্তর), সামশুদৌজা নবাব (ঢাকা ট্রিবিউন), মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত (ঢাকা মেইল), হারুন ইসলাম (নয়া দিগন্ত), সৌরভ ইসলাম (রাইজিংবিডি ডটকম), আসাদুজ্জামান খানসহ (মানবজমিন) ১০ সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে মানজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি, লিটন সাধারণ সম্পাদক। ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা বলেন, গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগ থানায় সৃষ্ট উত্তেজনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। তখন তাঁদের ওপর দুই দফায় হামলা করেন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের ভাষ্য, জাগোনিউজের ফেরদৌস ও রাইজিংবিডির সৌরভ ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাঁদের বাধা দেন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী। এর প্রতিবাদ জানান মানজুর। তখন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন ছাত্রদলের সাবেক সহ-স্কুলবিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান সামিথ। মানজুর নিজের পরিচয় দিলে তাঁকে গালি দেওয়া হয়। ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক এগিয়ে গেলে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা তাঁদের থানার বারান্দা থেকে ধাক্কা দিতে দিতে চত্বরে নিয়ে যান। এ সময় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. সাদ্দাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের নেতৃত্বে সংগঠনটির নেতা–কর্মীরা ‘শিবির-সাংবাদিক একসাথে চলে না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা। তাঁরা বলেন, এর কিছু সময় পর অন্য সাংবাদিকেরা থানায় উপস্থিত হলে ওবায়দুর এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে তা ছিল ‘নাটক’। এর কিছুক্ষণের মধ্যে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুজার গিফারী ইফাত হঠাৎ এসে বলতে থাকেন, ‘এই ভাইরে মারছে, এই ভাইরে মারছে।’ এ কথা বলে তিনি মব সৃষ্টি করেন। তখন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা উপস্থিত সাংবাদিকদের ওপর হামলে পড়েন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেন, আবুজার গিফারীর নেতৃত্বে এই হামলায় অংশ নেয় ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম আল নাসের মিশুক, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনসুর রাফি, শহীদুল্লাহ হলের সদস্যসচিব জুনায়েদ আবরার, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা সুলায়মান হোসেন রবি, সাকিব বিশ্বাস ও সাজ্জাদ খান, সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য কারিব চৌধুরী ও জাহিন ফেরদৌস জামি, কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের নেতা মোহতাসিম বিল্লাহ হিমেল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মমিতুর রহমান পিয়াল, নেতা হাসানসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম অনিক, ক্রীড়া সম্পাদক সাইফ খানসহ সংগঠনটির অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।