——————
মৎস্যজীবি সম্প্রদায়। মাছ ধরে জীবিকা অর্জন করে যারা।বিশেষ করে উপকূলীয় এবং গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষের পুরানো পেশা এটি।দেশের অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম অবদান এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর।দেশের মোট জিডিপিতে মৎস্যখাতের অবদান ২.৫৩% থেকে ৩.৫৭ % এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫% থেকে ৩২%। মানুষের আমিষ জাতীয় খাদ্যের যোগানদাতাও এই সম্প্রদায় ।বাংলাদেশের “ব্লু ইকোনমি” অন্চল খ্যাত বঙ্গোপসাগরের বিশাল জল সীমানায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলদস্যুদের উৎপাত সহ বিভিন্ন সমস্যা মাথায় নিয়ে জীবনবাজি রেখে মাছ ধরতে যায়, নিজের জন্য, দেশের জন্য। তবে দেখা যায় জেলেদের সামুদ্রিক সুরক্ষা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা অনেকটা অবহেলিত ।দারিদ্র্যতায় শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা অনগ্রসর গোষ্ঠীটি তেমন সচেতন নয়। সরকারি সুযোগ ও মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অনেকটা অন্ধকারে ।এই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, “দূর্ঘটনা জনিত কারণে নিজেদের সুরক্ষা ও পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য বীমা স্কিম ও কল্যাণ তহবিলের আওতায় আনতে পারলে তাঁরা অনেকটা উপকৃত হবে।ফলে আরও অধিক মানুষ এই পেশায় এগিয়ে আসতে আগ্রহী হতে পারে।সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১৫ মে থেকে ৫৮ দিন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণ বন্ধ থাকে।নিষেধাজ্ঞা কালীন বেকার হয়ে পড়ে মৎস্যজীবিরা।বছরের প্রায় সময় জুড়ে সাগরে মাছ ধরার কাজে থাকে বিধায় অন্য কোন কাজে তেমন পারদর্শীতা নাই তাদের ।মাছ ধরাতেই স্বস্তি, সাগরের নীলজলের সাথে পরম আত্মীয়তা।গাংচিলের সাথেই বন্ধুত্ব,স্রোতের নাচন এদের বলে দিয়ে যায় কোন জায়গায় জাল বিছিয়ে দিলে মাছ পাওয়া যাবে। আকাশের তারার সাথে মিতালী, বাতাসের গন্ধে বুঝতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ১১ জুন থেকে সাগরের পথে জেলেরা।
একেকটি ফিশিং নৌকায় কমপক্ষে ২০/৩০ জন লোক নিয়ে মাছ পাওয়া সাপেক্ষে ১০/২০ দিনের উপর অবস্থান করে গভীর সাগরে তাঁরা । সাগরে থাকা প্রতিটা মুহূর্তই জেলেদের জন্য ঝুকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও নানা কারণে নৌকা উলটে যেতে পারে।জলদস্যুর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে সাহায্যকারী কোন নৌকা বা টহলকারী নৌবাহিনীর নজরে আসলে উদ্ধার করা সম্ভবপর হতে পারে, নয়তো সাগরেই সলিল সমাধী।বলতে গেলে প্রাণবাজি রেখে জীবিকার তাগিদেই সাগরে কাজ করে তাঁরা ।অন্যদিকে হঠাৎ করে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও বিপদজনক।মারাত্মক অসুস্থদের গভীর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কিনারায় পৌঁছানো সময় সাপেক্ষও বটেই।তাই ভুক্তভোগী অনেকে
গভীর সমুদ্রে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের ব্যবস্থা করা জরুরী মনে করেন এবং সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,” হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট কোড থাকবে।কেউ অসহনীয় অসুস্থ হয়ে গেলে সেই কোড নাম্বারে নক করা হবে। ফলে অনায়াসেই জেলেরা চিকিৎসাসেবা পাবে কি়ংবা অবস্থা বেধে স্থলে পৌছানোর ব্যবস্থা করবে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ “।অন্যদিকে দূর্ঘটনা জনিত কারণে অনেকের প্রাণহানি কিংবা অঙ্গহানির কারণে পরিবার অসহায় হয়ে যায় বা চিকিৎসা খরচ জোগাড় করতে পারে না। তাই সমুদ্রে গমনকারী জেলেদের বাধ্যতামূলক ইনসুরেন্সের আওতায় আনতে পারলে তাঁরা অনেকটা সুরক্ষিত হবে আশাবাদী সমাজকর্মীদের। যতদুর জানা যায়,
জেলেদের ইনসুরেন্স বা বীমা আওতায় নিয়ে আসার বাধ্যগত আইন না থাকলেও আশাবাদের কথা যে জেলেদের জন্য বিশেষ বীমা পলিসি চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে সরকার। জলবায়ু পরিবর্তনে সাগরের পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জনিত কারণে ঝুকিপূর্ণ জেলেদের দূর্ঘটনা পরবর্তী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে জেলেদের জন্য জাতিসংঘের একটি গাইড লাইন দেওয়া আছে । সে নির্দেশনায় উল্লেখ্য যে,”জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO এর কোড অব কনডাক্ট ফর রেসপন্সিবিল ফিসারিজ এর ধারা ৮.২.৮ অনুযায়ী মাছ ধরার নৌকার মালিকের উচিত তাদের ক্রু বা জেলেদের জীবন ও স্বার্থ সুরক্ষায় পর্যাপ্ত বীমার ব্যবস্থা করা”।বাংলাদেশ সরকারও এই আন্তর্জাতিক গাইড লাইন অনুসরণ করে আইন ও নীতিমালা আধুনিকায়নের চেষ্টা করবে আশাবাদী সচেতন মহল।বীমা সংশ্লিষ্টদের মতামতে ” সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এর অধীনে অত্যান্ত স্বল্প প্রিমিয়ামে (বার্ষিক মাত্র ৬০) জনতা দূর্ঘটনা বীমার মাধ্যমে জেলেরা দূর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ পেতে পারে”। জেলেদের জন্য নিষেধাজ্ঞা কালীন বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।যেমন শুটকি পল্লীতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা,সরকারি বেসরকারি ভাবে হাঁস মুরগী গরু ছাগল পালনের সহায়তা কিংবা বিসিক এর আওতায় ক্ষুদ্র পরিসরে নানাবিধ কাজে লাগানো হতে পারে।
জেলেদের সুরক্ষা শুধু একটি মানবিক বিষয় নয়।এটি দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত। তাই জেলেদের সুরক্ষায় জাতীয় নীতিমালা প্রনয়ন সহ সামাজিক মর্যাদা ও উন্নত জীবন যাত্রার মান নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করার দাবী, সংশ্লিষ্ট মহলের।
————-
কলমে – বদরুল ইসলাম বাদল
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।