——————–
মাদক এক সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির নাম, যার বিষাক্ত ছোবল মানুষের সুন্দর জীবন এবং পরিবারকে সম্পূর্ণ তছনছ করে দেয়। বর্তমানে আধুনিকতার মোড়কে এই মরণনেশা তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশের মধ্যে সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যে তরুণ প্রজন্ম দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি, শক্তি ও সাহসের ঠিকানা; আজ তাদের একাংশই মাদকের অন্ধকারে পথ হারাচ্ছে। ফলে সমাজ এবং রাষ্ট্রে সৃষ্টি হচ্ছে চরম অস্থিতিশীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্মকে মাদকাসক্তির ফাঁদ থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে এক বিকলাঙ্গ সমাজ নির্মিত হবে। তাই মাদকের আগ্রাসন ঠেকানো সময়ের দাবি। চকরিয়া উপকূলীয় মানুষের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল মাতামুহুরী নদী বেষ্টিত সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয়েছে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। এই নতুন উপজেলাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। তবে সচেতন মহল মনে করে, শুরুর লগ্ন থেকেই যদি মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন ঠেকানো না যায়, তবে এই জনপদকে ঘিরে দেখা সমস্ত রঙিন স্বপ্ন অধরাই রয়ে যাবে। উপজেলাটিকে নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। দার্শনিক দৃষ্টিতে বলা যায়, “আপনি যদি সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চান, তবে মাদকমুক্ত মন ও শরীর নিয়েই তা সম্ভব। কারণ মাদক শুধু স্বপ্নকে নয়, স্বয়ং আপনাকেও গ্রাস করে।”
সাধারণ মানুষ আশা করে, নবগঠিত উপজেলাটি কেবল ইট-পাথরের দালানকোঠার চেয়ে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং প্রকৃতির অপার সৃষ্টিশীল বৈচিত্র্য সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবে। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এলাকার সর্বস্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে ঢেমুশিয়া, কোনাখালী ও পশ্চিম বড় ভেওলাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সমাবেশগুলোকে সমাজে প্রকৃত ইতিবাচক পরিবর্তনের আশার আলো হিসেবে দেখা যেতে পারে।তবে মনে রাখা ভালো, মূল সামাজিক ব্যাধিগুলোকে আড়ালে রেখে আমরা যদি কেবল বাহ্যিক জাঁকজমক দিয়ে মাতামুহুরীকে সাজাতে যাই, তবে তা হবে আত্মঘাতী। ভেতরের মাদক সমস্যা, কিশোর অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের স্থায়ী সমাধান না করে কেবল কাগজে-কলমে ‘মডেল উপজেলা’র তকমা লাগানো হবে ঠিক গ্রামীণ প্রবাদের সেই—‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ রাখার মতো এক নির্মম প্রহসন। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব পরিবারগুলোকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। একটি পরিবারে যখন কোনো তরুণ মাদকের ছোবলে পড়ে, তখন সেখানে চরম অশান্তি নেমে আসে এবং পুরো বাড়িটি নরকযন্ত্রণা ও জীবন্ত লাশে রূপ নেয়। সম্ভাবনাময় ছেলেটি বখাটে হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়, কর্মহীন হয়ে একসময় চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে লিপ্ত হয়। এই মরণনেশার চূড়ান্ত পরিণতিতে অকালেই ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ।অথচ আমাদের গ্রামীণ জনপদে এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত ছিল। প্রতিটি ইউনিয়নে উন্মুক্ত সবুজ খেলার মাঠ ছিল। স্কুল ছুটির পর সব কিশোর-তরুণ দল বেঁধে মাঠে ছুটে যেত—হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট থেকে শুরু করে ফুটবল ম্যাচে মেতে উঠত। সেই সুস্থ শরীরচর্চার ভিড়ে মাদক তো দূরের কথা, মুরুব্বিদের সামনে একটা সিগারেট খেতেও তরুণরা চরম লজ্জা পেত। কিন্তু আজ বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব, মাঠবিমুখতা এবং পারিবারিক শাসনের শিথিলতাই তরুণ সমাজকে মাদকের দিকে ধাবিত করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের ‘অপরাজনীতি’। টেন্ডারবাজি ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারে তরুণদের রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে মাদকের নেশায় আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
তাই মাদকবিরোধী আন্দোলনকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণমুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে; কোনো কর্মীর মধ্যে মাদকের বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা থাকলে তাকে দলে কোনো স্থান দেওয়া যাবে না। অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে, কোনো দলীয় পরিচয় যেন তার রক্ষার ঢাল না হয়। মাদকের মূল উৎপাটনে রাঘববোয়ালদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে। দেশপ্রেমিক সচেতন মানুষের নীরবতাই মাদকের সবচেয়ে বড় জ্বালানি। তরুণদের আহ্বান জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মাতামুহুরী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বদরুন নাহার কলি বলেন, “নিজেকে ভালোবাসুন, পরিবারকে ভালোবাসুন, প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। নিজের জীবনকে মাদকমুক্ত রাখুন এবং অন্যদেরও সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়তে উৎসাহিত করুন।”
প্রশাসনের মাদকবিরোধী সভাগুলো তখনই সফল হবে, যখন আমরা মাদকের মূল গডফাদারদের চিহ্নিত করে এর উৎসমূল ধ্বংস করতে পারব। একই সাথে, এলাকার মুরুব্বি, শিক্ষক ও সমাজকে আবার সেই পুরোনো অভিভাবকের ভূমিকা ফিরে পেতে হবে। আমরা অতীতের ব্যর্থ ইতিহাসের পথে হাঁটব না; বরং তরুণদের খেলার মাঠে ফিরিয়ে দেব। দলমত নির্বিশেষে মেকি প্রচারণার পেছনে না ছুটে, প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে মাতামুহুরীকে পরিবেশবান্ধব, মাদকমুক্ত ও একটি প্রকৃত গুণগত মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলে আমাদের এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে হবে।
———————
বদরুল ইসলাম বাদল
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী
ডেমুশিয়া, মাতামুহুরী উপজেলা