নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত আমাদের বাংলাদেশ।সবুজে আবৃত সুফলা ভূমি নিয়ে এদেশের উপর দিয়ে শত শত নদী সর্পিল গতিতে বয়ে গেছে। তেমনই পরিচিত নদী মাতামুহুরি। বান্দরবনের আলীকদম ও মায়ানমারের আরকান রাজ্যের সীমান্ত পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীটা যেন প্রকৃতি তার অপরুপ মায়ায় নিজেকে অংকন করেছে। আত্মভোলা মাতামুহুরি নদী লামা হয়ে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় এসে তার স্বমহিমায় অধিক শাখা নদীর জন্মদিয়ে বঙ্গোপসাগর সঙ্গমে আত্মবলি দান করে।প্রমত্তা মাতামুহুরী নদীটি চলার পথে চকরিয়ার বেতুয়া বাজার পয়েন্টে এসে তার দুবাহুর আবেষ্টনীতে জড়িয়ে ধরে আছে পরম মমতায় উপকূলীয় সাত ইউনিয়ন।যেমন, শাহারবিল,পূর্ব বড় ভেওলা,বিএম চর, কোণাখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা,ঢেমুশিয়া এবং বদরখালী ইউনিয়ন।এই সকল সাত ইউনিয়ন জুড়ে দীর্ঘ ২৬৭ কিলোমিটার মাতামুহুরি নদী প্রবাহিত হয়েছে।নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী মাতামুহুরী নদীর নামে নতুন উপজেলা “মাতামুহুরী” তার সৃষ্টির নান্দনিকতায় আলোকছটা ছড়াবে আশাবাদী উপজেলাবাসীর।জন্মের আতুড়ঘর থেকে মাতামুহুরি নদী অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। মাতামুহুরী নিয়ে আছে অনেক রুপকথা, গান অঁলা।আছে স্মৃতিগাঁথা সাহিত্য আর কবিতা। মাতামুহুরীতে মুগ্ধ কবি লুৎফা শাহুিনের ভাষায় ,” কী রোমান্টিক তোমার দিন বদলের মাতলামি প্রেমে মগ্নতায় বয়ে চলে জলের ধারা হে আশাময়ী নদী মাতামুহুরি””।মাতামুহুরী নিয়ে স্বপ্নদেখা মানুষের অভিমত, সদ্য জন্মানো শিশুকে সুষ্ঠুভাবে পরিচর্যা করা হলে তাঁর জীবন আলোকিত হয়ে উঠে।তেমনি পরিকল্পিত ভাবে প্রাকৃতিক অবয়ব নিয়ে সাজানো হলে দৃষ্টিনন্দন উপজেলা হিসেবে পরিচিত পাবে প্রত্যাশা প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের” ।তাদের অভিমত, মাতামুহুরী তার ভৌগোলিক পরিবেশ প্রতিবেশের অক্ষুন্নতা বহাল রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাবে । উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবী ছিল মাতামুহুরী উপজেলা। মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ এমপি মহোদয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল নবসৃষ্ট উপজেলাটি। তাই সাত ইউনিয়নের জনসাধারণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করবে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেখানে হ্নদয় ছুয়ে যায়,সেটাই গ্রাম।কাব্যিক ভাষায়, “যেখানে আকাশটা বড়,বাতাসটা খোলামেলা”।ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামীণ জনপদ ।এমনই পরিবেশে দাঁড়িয়ে নতুন সৃজন উপজেলা ” মাতামুহুরী”।তবে নতুন উপজেলা মানে তার আপনভূবনে সৃষ্টির উচ্ছ্বাসে নগরায়নের তোড়জোড় হবে, পূঁজি ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়ে যাবে।তবে অতি নগরায়নের আধিক্য কাম্য নয় মাতামুহুরি বাসীর। মাতামুহুরী বিধৌত স্বচ্ছ নির্মল পরিবেশ হারিয়ে যেতে যেন না পারে ,সেদিকে খেয়াল রাখার দাবী বসবাসরত বাসিন্দাদের। ।আকাশ ছুঁয়া ভবন নিয়ে শহরের যান্ত্রিক জীবনকে আধুনিকতা দাবী করে বিশেষ একটি মহল।তবে সেখানে নেই সামাজিক সহজাত ঔদার্যবোধ, পরম মমতা। বিকেন্দ্রীকরণ উপজেলায় থাকুক গ্রামীণ আমেজ,কৃষ্টি সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির বৈচিত্র্যতা। জেগে উঠুক মরে যাওয়া তার ছোটছোট শাখা নদীগুলো, ফিরে আসুক খাল-বিলের প্রাণচাঞ্চল্য।উম্মুক্ত খালে জাল বিছিয়ে মাছ স্বীকার করুক প্রান্তীক জনগোষ্ঠী।অবাধে সাঁতার কাটুক কিশোর কিশোরীরা। গ্রামীণ পরিবেশকে অক্ষুন্ন রেখে সাজানো হোক নিরাপদ একটি উপজেলা।যাতে দূরদূরান্তের মানুষের তীর্থ স্থানে পরিনত হবে । চাই না প্লট প্ল্যাট সহ জায়গাজমি নিয়ে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা।এই অঞ্চলের মানুষ সহজ সরল, উদারচিন্তার বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ । কর্পোরেট কোম্পানিগুলো এখানে এসে তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে জায়গা জমি গুলো যেন গিলে না নিতে পারে।এখানের অনেক পরিবার নিজেদের সামান্য জমি কি়ংবা ভিটেয় বসবাস করে।লোভাতুর ভূমি খেকোর ফাঁদ থেকে প্রান্তীক জনগোষ্ঠীদের রক্ষা করতে হবে।না হলে আবাসনহীন ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে এখানে ।মাতামুহুরি উপজেলা হোক মাতামুহুরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে লালিত একটি প্রশাসনিক কাঠামো।দেশের অনেক বড় বড় শহর গুলো অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে নানাবিধ সমস্যা নিয়ে জর্জরিত নগরবাসী। তাই শুরুতেই গ্রামীণ জনপদের আদলে উপজেলাটি রুপায়িত হবে এলাকার হতদরিদ্র মানুষের প্রতাাশা।
নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার ঐতিহ্যের অভ্যন্তরে পূড়া মাতামুহুরী ও ভরাট মাতামুহুরী হারিয়ে গেছে বললেই চলে।বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচির আওতায় উক্ত খাল গুলো ফিরিয়ে পাবে তার আগেকার গৌরব। এদিকে ডেমুশিয়া ইউনিয়নের বাজার পাড়ার বাসিন্দা মাষ্টার মোহাম্মদ হোসেন তার বাল্যকালীন স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন যে,”আমার বাড়ির পাশে আঞ্জামা খালকে ফেনা ও কচুরিপানায় ভরে গিয়ে এটিকে আর খাল বলে মনে হয় না”।তাই ফেনাগুলো পরিস্কার করে তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন প্রশাসনের প্রতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দাবি করেন তিনি ।এভাবে উপজেলার আওতাধীন সকল খালগুলো খননে ফিরে আসুক তার আসল স্বরূপে।না হলে মাতামুহুরি নদীর নামে নামকরণ করা মাতামুহুরী উপজেলার নামের মর্মার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে।হয়ত একদিন নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন তুলবে যে, উপজেলার নামটি কোনৃ রাজা মহারাজার নামে নামকরণ করা হয়েছিল? আর মাতামুহুরী টি কে ছিল?
মানুষ প্রাচীনকাল থেকে নদী কিংবা খালের দুপাড়ে বসতি স্থাপন করে আসছে যুগযুগ ধরে। বিস্তৃত ফসলি জমি গুলো ধান উত্পাদনের মাধ্যমে খাদ্যের অভাব দূর করে।কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সবখানে অপরিকল্পিত ভাবে যত্রতত্র বসত বাড়ি গড়ে তোলার কারণে ফসলের জমি কমে যাচ্ছে।অন্যদিকে পদ্ধতি নামক “মাছের প্রকল্প” বিশাল ধানের জমি গিলে নিচ্ছে।
সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠী প্রান্তিক কৃষকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ধানী জমিতে গড়ে তুলে পদ্ধতি নামক মাছের কৃত্রিম ঘের। মাতামুহুরী উপজেলার এক অভিশাপের নাম পদ্ধতি। তাই সচেতন মহল পদ্ধতি গুলো বন্ধ করে ধানী জমি গুলো উম্মুক্ত করে আবাদযোগ্য করার দাবী জানাচ্ছে। ফলে ভাত মাছের অভাব দূর হবে এখানের প্রান্তিক কৃষকদের।
গাঁয়ের মাটির গন্ধে মন ভরে যায়। বিষন্নতায় ভরা মানষিক অবসাদের কেউ আপন গা্ঁ’য়ে এসে সপ্তাহ খানিক সময় কাটালে তার অবসাদ দূর হয়ে যায়,পাবলিক হেল্থ বিশেষজ্ঞগণ এমনই মতপ্রকাশ করে থাকেন।নিজের গ্রামেই নিজেকে খুঁজে পায় সবাই।।কবি লুৎফা শাহিনের ভাষায়, “মাতামুহুরি আমাদের যৌবনমত্ত প্রাণের চোখে আঁকা অনাদিকালের ইতিহাস”। গ্রামীণ কাঠামোয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে নিরাপদ পরিবেশে বাসযোগ্য হবে নতুন উপজেলা। এমনটাই সময়ের জনপ্রত্যাশা।
——————-
কলমে – বদরুল ইসলাম বাদল
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।