——————————–
কক্সবাজার জেলার নব গঠিত মাতামুহুরি উপজেলা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। রাস্তাঘাট, পুকুর খাল-বিল পানিতে তলিয়ে একাকার হয়ে গেছে।মাতামুহুরী নদী বেষ্টিত উপকূলীয় সাত ইউনিয়ন নিয়ে নবজন্ম নেয়া মাতামুহুরি উপজেলা। উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং মাতামুহুরী নদীর প্রবল স্রোতে উপজেলার প্রতিরক্ষা বাঁধের পুরুইত্যাখালী ও মরংঘোনা পয়েন্টে বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে প্রবেশ করে। ফলে এখন দূর্যোগের চরম সীমা অতিক্রম করছে এই এই জনপদের মানুষ। পার্শ্ববর্তী পেকুয়া উপজেলা এবং চকরিয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ ক্ষতির আশংকা করছে এলাকাবাসী।
মাতামুহুরীর উপকূলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মানের। এই দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে অনেক লেখালেখি, সভা সেমিনার সহ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে জনগণ। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন শুধু আশার বানী শুনিয়ে গেল, কাজের কাজ কিছু হয় নাই। বর্তমান সময়ের ভয়াবহ বন্যা মানুষের দুর্ভোগের সমস্ত সীমা অতিক্রম করছে। তাই আর প্রতিশ্রুতি নয়,” টেকসই বেড়িবাঁধ” নির্মান এখন বাঁচা-মরার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
সূত্র মতে “সাত ইউনিয়ন বেষ্টিত বেড়িবাঁধের আয়তন ১,০০০ হেক্টরের অনেক বেশী। (যার মোট আয়তন ১৪৩৮০ হেক্টর)। তাই আইন ও বিধি অনুযায়ী এই বেড়িবাঁধের সংস্কার সিসি ব্লক স্থাপন বা স্থায়ীভাবে বেড়িবাঁধ নির্মানের সম্পুর্ন দায়িত্ব এককভাবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এখতিয়ার”। বর্তমান সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এই জনপদের ভূমিপুত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ এমপি মহোদয়ে কাছে মাতামুহুরি বাসিন্দাদের নিবেদন, “আপনি পারেন এই জনপদের মানুষকে বাচাঁতে। আপনার তত্ত্বাবধানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান করা হলে আপনাকে এই জনপদের মানুষ যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবেন”।
জল পড়ে পাতা নড়ে। বহুল প্রচলিত একটি কথিকা। তেমনিভাবে বর্ষা এলেই উপকূলীয় বাসীর জন্য কান্নাকাটি বেড়ে যায় নেতাদের। বেড়িবাঁধ , স্লুইসগেট নিয়ে কথা হয়। আবেগ ভালবাসার জায়গায় থেকে নানাবিধ প্রতিশ্রুতি আসে। টনক নড়ে, হুলুস্থুল ভাবে। যেন এখনই হয়ে যাবে বাঁধ নির্মাণ। ত্রাণ নিয়ে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ। মানবসেবায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার হাঁকডাক। দুর্যোগ না হলে নেতাদের হয়তো জনসেবার সুযোগ সৃষ্টি হয় না। হয়ত এই জন্যই সমস্যা জিইয়ে রাখে।
চকরিয়া পেকুয়া মাতামুহুরি উপজেলায় বন্যা নতুন কথা নয়। উজানে বৃষ্টি হলে দ্রুত বেগে পানি সাগরের দিকে দাবিত হবে। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়ম এমনই। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হলে অন্য কথা। কিন্তু মৌসুমের বৃষ্টি হবেই স্বাভাবিক। বৃষ্টি না হওয়াটা অস্বাভাবিক। তাই এসময়ের বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক বৃষ্টি কিংবা হঠাৎ করে বন্যা হিসেবে চালিয়ে যাওয়া যায় না। এটা প্রথম বন্যা নয় এই জনপদে। বিগত দিনেও বৃষ্টির কারণে বৃহত্তর চকরিয়া উপকূল ডুবে গিয়েছিল। অনেকে এমন সব বন্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতেও নারাজ।কারণ উজানের পানি তার সৃষ্টির বৈচিত্র্যতা নিয়ে এগিয়ে যাবে। অরক্ষিত বেড়িবাঁধের দূর্বল পয়েন্টে প্রবল স্রোত নিয়ে আঘাত করবেই। তাই অরক্ষিত বেড়িবাঁধের দূর্বল পয়েন্টে ভেঙে গেলে নদী কিংবা পানিকে দায়ী করা যাবে না।
অসতর্কতা, প্রশাসনের অবহেলা, নেতাদের দূরদর্শিতার অভাবকে দায়ী করা যাবে। প্রমত্তা মাতামুহুরি আগের নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে,বালু ও পলি জমে তার তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। দখল এবং ভরাটের কারণে নদীর তার আদিসত্তা হারিয়ে ফেলেছে, সুরু চিকন হয়ে গেছে। উজান থেকে নেমে আসা পানি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে ফুলেফেঁপে লোকালয়ে প্রবেশ করে। দূর্বল বেড়িবাঁধ বারবার ভেঙ্গে যায়। এসব নতুন কিছু নয়। এই সমস্যাটি নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, হয়েছে সেমিনার, মানববন্ধন।
পরিবেশবাদি সংগঠন ” ধরা এবং “বাপা বিগত বছরগুলোতেও নানাবিধ কর্মসূচি পালন করে।অন্যদিকে প্লাবিতদের নিয়ে শুরু হয় নোংরা রাজনীতি। মায়া কান্না, নৌকায় করে ত্রাণ।বিগত সরকারগুলোর আমলেও দেখেছি, এর আগেও ছিল। বেড়িবাঁধ নির্মানে আস্বাসেই খতম। তবে বেড়িবাঁধ নির্মান নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনো আসে নাই।ভুক্তভোগী একজনের অভিমত, ” উপকূলীয় মানুষের আবেগের সাথে অনেক খেলা হয়েছে। বন্ধ করুন এসব। আমরা ত্রাণ চাই না,রিলিফ চাই না। ভিক্ষা চাই না। স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ চাই।”দি ডেইলি স্টার” পত্রিকায় প্রকাশিত ১১,৭,২৬ তারিখের শিরোনাম ছিল যেমন, “ঘের বাঁচাতে বেআইনি ভাবে স্লুইসগেট বন্ধ রাখায় চট্টগ্রাম কক্সবাজার বন্যা দীর্ঘায়িত”। দুর্গত এলাকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মানুষের সাথে কথা বলে শিরোনামটি শতভাগ সত্যি হিসেবে মনে করে,সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ ডেমুশিয়া ৫ নং স্লুইসগেট পাহারা দেওয়ার জন্য পশ্চিম বড় ভেওলা এবং বদরখালী ইউনিয়ন থেকে গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মানুষ কি পরিমাণ ফেরোশাস হলে এই সময়ে কেউ গেইট বন্ধ করে, কেউ খুলে দিয়ে যায়, কেউ বাঁধে। যেন ইদুর বিড়াল খেলা। জনস্বার্থ বিবেচনায় অতি বৃষ্টিপাতের কারণে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত স্লুইসগেট এখন মাছ ধরার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহুত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে স্লুইসগেট ইজারা দেওয়ার হয়। ফলে লক্ষ মানুষের আহাজারি তাদের কানে লাগে না। গত বন্যার সময় স্লুইসগেট ইজারা দেওয়ার বন্ধ নিয়ে দাবী উঠে ছিল। পরে আবার অদৃশ্য কারণে ইজারা দেওয়া হয়।
চাল ডাল দিয়ে মানুষকে সাময়িক সান্ত্বনা দেওয়া যায়।স্থায়ী ভাবে নয়। উপকূলীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবন মাল, কৃষকদের ফসল, মৎস্যজীবীদের মাছের ঘের রক্ষা করতে স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান চায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
————
বদরুল ইসলাম বাদল
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।