বদরুল ইসলাম বাদল
————————–
ডেঙ্গু মশাবাহিত ভাইরাস-জনিত একটি মারাত্মক রোগের নাম। অদমনীয় সংক্রমণের কারণে ডেঙ্গু রোগটি এখন সামাজিক আতঙ্ক হিসেবে জনসাধারণের মাঝে চরম ভীতির উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগকে ‘হাড়-ভাঙা জ্বর’ও বলা হয়; কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং নানান ধরনের প্রকৃতিগত অসংগতির জন্য এবছর ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। মূলত এডিস মশার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটে। এই রোগের সংক্রমণ দেশজুড়ে ব্যাপক আকার ধারণ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশজুড়ে ‘জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান’ চালু করেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান’ (নিপসম)-এর কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, “ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এবছর ঢাকার বাইরে বেশি হচ্ছে। সময়মতো এডিস মশা নিধন এবং স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম না নেওয়ার কারণে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এডিস মশা ছড়িয়ে পড়ছে।” মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেঙ্গু রোগটি সারা পৃথিবীতে ভয়ানক মহামারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
প্রসঙ্গত, ১৭৭৯ সালেই রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়। কিন্তু আজ অবধি ডেঙ্গুর কোনো স্থায়ী প্রতিষেধক বা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো ডেঙ্গু ভ্যাকসিন আনুষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মতে, ‘সচেতনতা ও সাবধানতা অবলম্বনই হলো ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার’। এডিস মশা অনেকটা ‘গৃহপালিত মশা’ হিসেবে পরিচিত। ঘরের ভেতরের এসি কিংবা ফ্রিজের ট্রে, উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা চিপসের প্যাকেট, নারিকেলের খোসা, ওয়ান-টাইম কাপ কিংবা প্লাস্টিকের আসবাবপত্র যত্রতত্র ফেলে রাখা হলে সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে পানি জমে থাকে।
নালা-নর্দমার নোংরা পানিতে নয়, বরং এই সব কৃত্রিম উপায়ে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়ে। একসময় ডেঙ্গুকে শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কিন্তু ডেঙ্গু নিধনে অব্যবস্থাপনার ফলে এটি এখন প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।রাজধানী ঢাকার বাইরে যেসব জেলা এখন ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, তার মধ্যে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে।
এখানকার বিশাল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত রয়েছে। অনেক পর্যটক হয়তো নিজের অজান্তেই ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে আনছেন, আবার এখান থেকে আক্রান্ত হয়ে নিজ জেলায় ফিরে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর চরম ঘনবসতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ত্রিপলের ছাউনি আর বাঁশের খুঁটি গেড়ে তৈরি ঝুপড়ি ঘরে তাদের বসবাস। অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ময়লা-আবর্জনার স্তূপ সেখানে এডিস মশার বিশাল প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
পরিসংখ্যান মতে, কক্সবাজার জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের একটি বিরাট অংশই রোহিঙ্গা নাগরিক। স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িতদের মতে—স্থানীয় জনসাধারণ, পর্যটক এবং রোহিঙ্গাসহ এই ত্রিমুখী চাপে কক্সবাজারের চিকিৎসাসেবা সামলানো চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজটি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেড় যুগেরও বেশি সময়ে এর নিজস্ব ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি সচল করতে কর্তৃপক্ষ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালটিকে সব সময় ধারণক্ষমতার ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি রোগী নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি কক্সবাজার শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় মুমূর্ষু কোনো রোগীকে সেখানে রেফার করা হলে পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে। তাই জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল—কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি দ্রুততার সাথে পরিপূর্ণ হাসপাতাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক।
ভুক্তভোগীদের অভিমত, বর্তমান সময়ে অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্তদের সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।এই মহাসংকট থেকে উত্তরণে সচেতন নাগরিকদের স্পষ্ট অভিমত—সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগই পারে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, নাগরিক হিসেবে আমাদের সবারই সমান দায়িত্ব রয়েছে। নাগরিক অধিকার নিয়ে আমরা যেমন উচ্চকণ্ঠে কথা বলি, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিও আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা থাকে।
পৌরসভার বা বিশেষ অভিযানে আসা কর্মীরা কখনোই আপনার ঘরের কোণে কোণে গিয়ে পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে আসবে না। তাই নিজেকেই নিজের বাড়ির আঙিনা কিংবা ঘরের ভেতরের মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমার বাড়ি পরিচ্ছন্ন করার প্রাথমিক দায় আমার নিজের। কারণ মশার কামড়ে আক্রান্ত হতে পারি আমি, আমার পরিবারের সদস্য কিংবা আমার প্রতিবেশী।ঝুঁকিতে যেহেতু আমরা নিজেরাই, তাই সচেতনতার আন্দোলন আমাদের নিজেদেরই শুরু করতে হবে। ‘৩ দিনে ১ দিন, জমা পানি ফেলে দিন’—এই স্লোগানটি প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্নতাকে একটি স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ‘লার্ভা হান্টিং টিম’ গঠন, যুবকদের সম্পৃক্তকরণ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের জুমার নামাজে খুতবাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ে জোরালো প্রচার চালাতে হবে।হোটেল-মোটেল জোন ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রশাসনকে সরাসরি নার্ভা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।পর্যটন নগরীকে নিরাপদ রাখতে চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাস্তবমুখী সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু আতঙ্কের বিষয় নয়; লোকদেখানো প্রচারণামূলক আনুষ্ঠানিকতার বৃত্ত ভেঙে সচেতনতা যখন সরাসরি কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধে রূপ নেবে, তখনই ডেঙ্গুর সম্পূর্ণ বিনাশ সম্ভব।
—————
বদরুল ইসলাম বাদল
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।