বদরুল ইসলাম বাদল
রেলগাড়ি, আমাদের স্বপ্নের রেলগাড়ি! সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই জনপদের মানুষের বুকে লালিত এক গভীর আশা-আকাঙ্ক্ষা—ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম যাবে, ঢাকা যাবে। অবশেষে সুদীর্ঘ ১৩৩ বছর পর দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ হলো, ঝকঝক শব্দে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চোখের সামনে দিয়ে চলেও গেল। কিন্তু বৃহত্তর চকরিয়াসহ আশেপাশের সাতটি উপজেলার লাখ লাখ মানুষের সেই লালিত স্বপ্ন আজও এক নিষ্ঠুর উপহাসের মতো অধরাই রয়ে গেল।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে চকরিয়া দক্ষিণ-চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক হৃৎপিণ্ড। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দাপ্তরিক সংযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের তাগিদে এই চকরিয়ার বুক চিরেই সবাইকে যাতায়াত করতে হয়। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী কক্সবাজারের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই জনপদের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ তীব্র দাবি সত্ত্বেও ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়কটি আজও চার লেনে উন্নীত না হওয়ায় প্রতিনিয়ত এই বিপজ্জনক সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ, বাড়ছে অন্তহীন যাত্রী দুর্ভোগ। সড়ক যোগাযোগের এই চরম নিরাপত্তাহীনতার বিপরীতে চকরিয়াবাসীর কাছে রেলপথই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক বিকল্প। আর সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই ডানা মেলেছিল কক্সবাজার পর্যন্ত স্বপ্নের রেলপথ নির্মাণের মহাপরিকল্পনা।
ব্রিটিশ আমলে ১৯২২ সালে ডুয়েল গেজ রেলপথের যে প্রাথমিক সূচনা হয়েছিল, তার সফল বাস্তবায়ন ঘটে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে। প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ১০০ কিলোমিটারের এই ডুয়েল গেজ মেগা প্রকল্পের একটি সিংহভাগ অংশজুড়ে ছিল চকরিয়া। কিন্তু উদ্বোধনের সেই মহা আনন্দ চকরিয়াবাসীর জন্য দ্রুতই এক চরম বিষাদ ও অপমানে রূপ নেয়, যখন তারা জানতে পারে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত eye-catching চকরিয়া স্টেশনে কোনো যাত্রীবাহী আন্তঃনগর ট্রেনের চাকা থামবে না।
চকরিয়া কোনো সাধারণ মফস্বল স্টেশন নয়। এটি কক্সবাজার জেলার বৃহত্তম উপজেলা এবং পুরো অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী এবং বান্দরবানের লামা-আলীকদমের লাখ লাখ মানুষ দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে চকরিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যখন চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাজে রাজধানীমুখী হচ্ছেন, তখন এত বড় একটি অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাবহুল জংশনকে পাশ কাটিয়ে নন-স্টপ ট্রেন চালানো পরিবহন বিজ্ঞানের চরম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। স্টেশন ও আধুনিক প্ল্যাটফর্ম সবই আছে—নেই কেবল স্থানীয় লাখো মানুষের ন্যায্য অধিকার।
তাত্ত্বিকভাবে স্টেশনটির নাম ‘চকরিয়া রেলওয়ে স্টেশন’ রাখা হলেও, ভৌগোলিক সীমানার দিক থেকে এটি বর্তমানে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সংযুক্ত করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; কারণ এর মাধ্যমে মাতামুহুরী উপজেলার আপামর জনসাধারণের নিজস্ব পরিচয়, অধিকার এবং ত্যাগ আরও স্পষ্টভাবে তারকাচিহ্নিত ও স্বীকৃত হবে। এই দাবির পেছনে কেবল যাত্রী সংখ্যাই নয়, বরং এই অঞ্চলের বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্ব জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে মাতামুহুরী অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী “মাছ ও লবণ” শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাছাড়া পাশের মহেশখালী-মাতারবাড়িতে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গভীর সমুদ্র বন্দর। এই মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে হয়। চকরিয়া স্টেশনে যাত্রাবিরতি না থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আজ চরমে পৌঁছেছে।
আর এই বঞ্চনা আজ রূপ নিয়েছে এক তীব্র ও আপসহীন গণদাবীতে।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর চকরিয়া রেলস্টেশন এলাকায় সর্বস্তরের জনসাধারণের উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সুজনসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে হাজার হাজার ভুক্তভোগী মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। এই বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক, চকরিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আ. ক. ম. গিয়াস উদ্দিন চকরিয়া স্টেশনে যাত্রাবিরতির দাবিকে গণমানুষের প্রাণের দাবি উল্লেখ করে বলেন, “সাতটি উপজেলার এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ লাঘবে চকরিয়া স্টেশনই হতে পারে একমাত্র ভরসা। এই স্টেশন থেকে মানুষ সরাসরি ঢাকায় যেতে চায়”। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “জনস্বার্থে বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত”।
উপকূলীয় এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাও এর চেয়ে আলাদা নয়। যেমন মাতামুহুরী উপজেলার ডেমুশিয়া ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা এবং কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্রী ফারিফতা ইসলাম ইশাল জানায়, সে চকরিয়া স্টেশন থেকেই সরাসরি ট্রেনে চড়ে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঢাকায় যেতে চায়। কিন্তু স্টপেজ না থাকায় তার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর এই যৌক্তিক চাওয়া আজ অপূর্ণ। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, চকরিয়ার মতো বাণিজ্যিক হাবে মাত্র ৫ মিনিটের একটি বাণিজ্যিক স্টপেজ দিলে ট্রেনের সামগ্রিক শিডিউলে কোনো বিপর্যয় ঘটবে না।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, চকরিয়া রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতির দাবিটি আজ আর কোনো বিলাসী চাওয়া নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং উপকূলীয় প্রান্তিক অঞ্চলের জীবনযাত্রার গতি সচল রাখতে এখানে ট্রেনের স্টপেজ অপরিহার্য। চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়াসহ আশেপাশের সাতটি উপজেলার লাখ লাখ অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও মানবিক দুর্দশা লাঘবে চকরিয়া স্টেশনে ট্রেন থামানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় যৌক্তিক দাবি।
একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের উন্নয়ন মহাযজ্ঞ তখনই সার্থক হয়, যখন তার সুফল স্থানীয় করদাতার দোরগোড়ায় পৌঁছায়। চকরিয়ার ফসলি জমি আর ভিটেমাটি অধিগ্রহণ করে চোখধাঁধানো স্টেশন ভবন নির্মিত হবে, অথচ চকরিয়ার মানুষ দূর থেকে সেই ট্রেনের ধুলো ওড়ানো দেখবে—এমন উন্নয়ন দর্শনের চেয়ে নিষ্ঠুর প্রহসন আর কী হতে পারে? এটি কেবল বৈষম্য নয়, স্থানীয় ভূখণ্ডের মানুষের আত্মত্যাগের চরম অবমাননা। রেল কর্তৃপক্ষের উচিত তথাকথিত ‘ডিরেক্ট’ সার্ভিসের যান্ত্রিক গোঁড়ামি আর টেকনিক্যাল অজুহাত ছুড়ে ফেলে অবিলম্বে চকরিয়া রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি কার্যকর করা। অন্যথায় এই পুঞ্জীভূত জনক্ষোভ যেকোনো সময় রেলের চাকা অচল করে দেওয়ার মতো গণবিস্ফোরণে রূপ নিলে তার দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
——–
কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।
ডেমুশিয়া, মাতামুহুরী উপজেলা